আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী মধ্যস্থতাকারী হতে পারে ভারতই, পাকিস্তানের চেষ্টায় জল ঢেলে বার্তা রাশিয়ার

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী মধ্যস্থতাকারী হতে পারে ভারতই, পাকিস্তানের চেষ্টায় জল ঢেলে বার্তা রাশিয়ার

পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার আবহে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হলো। দিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস (BRICS) রাষ্ট্রগোষ্ঠীর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দিয়ে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এক তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বে ভারতই একমাত্র ‘দীর্ঘমেয়াদী মধ্যস্থতাকারী’র ভূমিকা পালন করতে পারে। রাশিয়ার এই অবস্থান আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের কূটনৈতিক আকাক্ষার জন্য বড় ধাক্কা বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।

বর্তমানে পাকিস্তান নিজেকে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তিদূত হিসেবে তুলে ধরার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে ল্যাভরভের মতে, সাময়িক সংলাপের ক্ষেত্রে পাকিস্তান ভূমিকা রাখলেও, দীর্ঘমেয়াদী ও নির্ভরযোগ্য সমাধানের জন্য ভারতের ব্যাপক কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য।

পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতা সংকট ও নেপথ্যের কারণ

সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষের কাছেই পাকিস্তানের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতার ওপর অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের কিছু চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন। সেখানে দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন বা ইজরায়েলি হামলা থেকে বাঁচাতে ইরানের সামরিক বিমানগুলোকে নিজেদের ‘নূর খান বিমান ঘাঁটিতে’ লুকিয়ে রাখার অনুমতি দিয়েছিল পাকিস্তান।

এই ঘটনা একদিকে যেমন আমেরিকার কাছে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যকে সন্দিহান করে তুলেছে, অন্যদিকে ইরানও মনে করছে পাকিস্তান মার্কিন চাপে কাজ করছে। ফলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদের গ্রহণযোগ্যতা চরম সংকটে পড়েছে।

ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি ও বৈশ্বিক প্রভাব

পাকিস্তানের এই ব্যর্থতার বিপরীতে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো নয়াদিল্লির সুষম কূটনীতি। ভারতের সাথে ইরানের যেমন কৌশলগত জ্বালানি ও সংযোগ অংশীদারিত্ব রয়েছে, ঠিক তেমনই আমেরিকার সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

ব্রিকস বৈঠকেও ভারত নিজেকে একটি দায়িত্বশীল শক্তি হিসেবে প্রমাণ করেছে। বৈঠকে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর (UAE) মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ হলেও ভারত কোনো পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “শান্তি খণ্ড খণ্ডভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়।”

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই প্রস্তাবের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে তাঁর একক বৈঠক পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারতের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিনসহ এশিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের এই সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা বিশ্বমঞ্চে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে নয়াদিল্লির অবস্থানকে আরও এক ধাপ উচ্চে নিয়ে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *