ডাস্টবিন থেকে ঘুলঘুলি, প্রেসিডেন্সি জেলের চার ঘণ্টার মেগা অপারেশনে উদ্ধার ২৩ মোবাইল!

ডাস্টবিন থেকে ঘুলঘুলি, প্রেসিডেন্সি জেলের চার ঘণ্টার মেগা অপারেশনে উদ্ধার ২৩ মোবাইল!

প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার দেওয়াল ভেদ করে কয়েদিরা কীভাবে জেলের ভেতরেই গড়ে তুলেছিল এক সমান্তরাল ‘ডিজিটাল সাম্রাজ্য’, তা প্রকাশ্য আসতেই রাজ্যজুড়ে তীব্র শোরগোল পড়ে গেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাংবাদিক বৈঠকের পর এখন সর্বত্র একটাই প্রশ্ন, প্রশাসনের নজর এড়িয়ে কীভাবে এই কাণ্ড ঘটছিল? গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রেসিডেন্সি জেলে চালানো চার ঘণ্টার এক রুদ্ধশ্বাস মেগা অপারেশনে উদ্ধার হয়েছে ২৩টি মোবাইল ফোন। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাপ্রবাহের জেরে ইতিমাজেই জেলের সুপার ও চিফ কন্ট্রোলারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং পুরো ঘটনার তদন্তভার তুলে দেওয়া হয়েছে সিআইডি-র হাতে।

যেভাবে চলল রুদ্ধশ্বাস তল্লাশি অভিযান

গোয়েন্দাদের কাছে সুনির্দিষ্ট খবর ছিল যে, জেলের ভেতর থেকেই জাঁদরেল অপরাধীরা বাইরের দুনিয়ায় অপরাধের ছক কষছে। এই লিড ধরে বৃহস্পতিবার বিকেলে সংশোধনাগারে আচমকা হানা দেন তদন্তকারীরা। বন্দিদের সেলে ঢুকে চালানো হয় তন্নতন্ন তল্লাশি। অপরাধীদের গোপন আস্তানা খোঁজার তালিকায় বাদ যায়নি জেলের ডাস্টবিনও। ডাস্টবিনের জমানো নোংরা সরাতেই প্লাস্টিকের মোড়কে মোড়ানো অবস্থায় একের পর এক মোবাইল ফোন বেরিয়ে আসতে শুরু করে। শুধু ডাস্টবিনই নয়, সেলের পুরোনো দেয়ালের আলগা পলেস্তারা আর ইটের খাঁজের সামান্য ফাটলগুলোকে কয়েদিরা বানিয়ে ফেলেছিল নিখুঁত গোপন ‘লকার’। এছাড়া বাথরুমের ঘুলঘুলি, ভেন্টিলেটরের ধুলোমাখা কোণ এবং একজস্ট ফ্যানের ব্লেডের পেছনেও লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ফোনগুলো।

উদ্ধার হওয়া ফোনের ধরন ও অপরাধের জাল

চার ঘণ্টার এই ম্যারাথন অভিযানে মোট ২৩টি ফোন উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ২২টিই অত্যন্ত ছোট আকারের ‘মাইক্রো ফোন’। এই ফোনগুলো এতই ছোট যে অনায়াসে হাতের তালুতে লুকিয়ে ফেলা যায়। তবে গোয়েন্দাদের সবচেয়ে বেশি চিন্তায় ফেলেছে উদ্ধার হওয়া একটি অত্যাধুনিক ‘অ্যান্ড্রয়েড’ ফোন। তদন্তে জানা গেছে, ধরা পড়ার ঝুঁকি কমাতে এই ফোনগুলো সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট বন্দির কাছে রাখা হতো না; বরং জেলের ‘কমন স্পেস’ বা সাধারণ জায়গাগুলোতে লুকিয়ে রাখা হতো। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, সন্দেশখালির শাহজাহানের মতো বহু দাগী আসামী জেলের ভেতরে বসেই বাইরে তাদের অপরাধের নেটওয়ার্ক সচল রাখছিল।

প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ ও সম্ভাব্য প্রভাব

এই দুর্ভেদ্য অপরাধচক্রের শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখতে সিআইডি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ফোনগুলো থেকে কারা এবং কতবার বাইরে যোগাযোগ করেছে, তা নিশ্চিত করতে ‘ভয়েস স্যাম্পলিং’ বা কণ্ঠস্বর পরীক্ষা করা হবে। বিদায়ী তৃণমূল জমানার ঢিলেঢালা শাসন ও জেল কর্তৃপক্ষের একাংশের পরোক্ষ মদত ছাড়া এমন ঘটনা আসাম্ভব বলে মনে করছে বর্তমান সরকার। কর্তব্যে গাফিলতির দায়ে জেলের সুপার ও চিফ কন্ট্রোলারকে তাৎক্ষণিকভাবে সাসপেন্ড করার পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এই সিম কার্ডগুলো কার নামে নথিভুক্ত এবং বাইরে থেকে কারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন, তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলের ভেতরের এই ‘নিরাপদ ডেরা’ সংস্কৃতি পুরোপুরি নির্মূল করাই এখন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *