সাত দিনেই অ্যাকশন মুডে নতুন মুখ্যমন্ত্রী, শুভেন্দুর ২০ সিদ্ধান্তে নড়চড়ে বসল বাংলার প্রশাসন!

সাত দিনেই অ্যাকশন মুডে নতুন মুখ্যমন্ত্রী, শুভেন্দুর ২০ সিদ্ধান্তে নড়চড়ে বসল বাংলার প্রশাসন!

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বড়সড় পটপরিবর্তন ঘটেছে। মাসকয়েক আগেও যিনি বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার চেয়ারে বসতেন, সেই শুভেন্দু অধিকারী এখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। গত ৯ মে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দেশের একাধিক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে সাড়ম্বরে শপথ নিয়েছে রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকার। ক্ষমতায় আসার আগে চাকরি, নারী সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে ফেলার একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল গেরুয়া শিবির। হাতে পাঁচ বছর সময় থাকলেও, দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র সাত দিনের মধ্যেই ২০টি বড় ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট বার্তা দিলেন যে, প্রশাসন পরিচালনায় তিনি কোনো সময় নষ্ট করতে রাজি নন।

প্রশাসনিক সংস্কার ও জনমুখী ঘোষণা

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই শুভেন্দু অধিকারীর প্রথম ও অন্যতম চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত ছিল প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু নবান্ন থেকে পুনরায় ঐতিহ্যবাহী রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ফিরিয়ে আনা। বিগত সরকারের ছেড়ে যাওয়া রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ইতিমধ্যেই সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে এবং মুখ্যমন্ত্রীর ঘরও সাজিয়ে তোলা হয়েছে। বেকার যুবকদের স্বস্তি দিয়ে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই সরকারি চাকরির ঊর্ধ্বসীমা ৫ বছর বৃদ্ধি করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, মহিলাদের আর্থিক সুরক্ষায় আগামী ১ জুন থেকে চালু হচ্ছে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্প, যার আওতায় মহিলারা প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা পাবেন এবং সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারবেন।

কৃষি ও পরিকাঠামো ক্ষেত্রেও দ্রুত পদক্ষেপ করেছে নতুন সরকার। পূর্বতন সরকারের আমলে ভিনরাজ্যে আলু রফতানি বন্ধ থাকায় চরম বিপাকে পড়েছিলেন কৃষকরা। নতুন মুখ্যমন্ত্রী এসেই সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে রফতানি চালুর নির্দেশ দেওয়ায় স্বস্তিতে আলু চাষিরা। এছাড়া, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা চিংড়িঘাটায় মেট্রো রুটের মাত্র ৩৬৬ মিটার সংযোগের কাজ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে দ্রুত শুরু করার ছাড়পত্র দিয়েছে এই সরকার। বাংলাদেশ সীমান্তে জমি জটের কারণে যেখানে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ আটকে ছিল, তা আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে হস্তান্তর করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান

প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং দুর্নীতি দমনে শুরুতেই অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আদালতের রায় মেনে ‘অযোগ্য’ প্রার্থীদের থেকে বেতন ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে শিক্ষা দফতর। একই সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করতে স্কুল ও কলেজের সমস্ত পরিচালন সমিতি ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং কলেজে ভর্তির নামে তোলাবাজি রুখতে সম্পূর্ণ অনলাইন কেন্দ্রীয় পোর্টাল চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলায় জেলায় বেআইনি টোল প্লাজা বা ‘তোলা’ আদায়ের চল এক ধাক্কায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জেলের ভেতর থেকে অপরাধ চক্র চালানো রুখতে প্রেসিডেন্সি জেলে আচমকা অভিযান চালিয়ে মোবাইল উদ্ধারের পর সেখানকার সুপার ও চিফ কন্ট্রোলারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ দেখা গেছে রাজ্য রাজনীতিতে সাড়া ফেলে দেওয়া ‘আরজি কর কাণ্ড’ নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সপ্তম দিনেই এই ঘটনার সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে বিনীত গোয়েল, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং অভিষেক গুপ্তা—এই তিন হেভিওয়েট আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। অন্যদিকে, কলকাতার তিলজলার এক বেআইনি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ২ জনের মৃত্যুর পর, ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেখানে বুলডোজার চালিয়ে বেআইনি নির্মাণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা রাজ্যে কার্যত নজিরবিহীন।

সামাজিক অনুশাসন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভোলবদল

সামাজিক ও পরিবেশগত শৃঙ্খলা ফেরাতেও বেশ কিছু কড়া নিয়ম জারি করেছে নতুন সরকার। সব সরকারি স্কুলে প্রার্থনা সঙ্গীতের পর ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ধর্মীয় স্থানগুলিতে শব্দের নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং কসাইখানার বাইরে বা নির্দিষ্ট শংসাপত্র ছাড়া প্রকাশ্যে গবাদি পশু জবাই করার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আনা হয়েছে। পথ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে রাজ্যজুড়ে হেলমেট-বিহীন চালকদের বিরুদ্ধে কড়া পুলিশি অভিযান শুরু হয়েছে।

সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অধিকার সুনিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য দফতরেও বড়সড় রদবদল আনা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে স্বাস্থ্য দফতরের দায়িত্ব সামলে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো সরকারি হাসপাতাল ‘বেড নেই’ বলে রোগী ফেরাতে পারবে না। প্রয়োজনে অন্য সরকারি বা কেন্দ্রীয় হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সাথে সমস্ত বেসরকারি হাসপাতালকেও একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের এই ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে শুভেন্দু সরকার বুঝিয়ে দিল, আগামী দিনে রাজ্যের প্রশাসনিক রাশ তারা কতটা শক্ত হাতে ধরতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *