৫০ বছরের রহস্যের অবসান, বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কার ‘এমএএল’ রক্তের গ্রুপ!

রক্তের একটি রহস্যময় অ্যান্টিজেনের জিনগত ভিত্তি খুঁজতে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক ব্লাড গ্রুপ সিস্টেমের হদিস পেলেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে গবেষণার পর ব্রিটেন ও ইজ়রায়েলের গবেষকেরা রক্তের ‘এএনডব্লিউজে’ (AnWJ) গ্রুপের নেপথ্যে থাকা জিনটি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ‘এমএএল’ (MAL) নামের এই নতুন ব্লাড গ্রুপ সিস্টেমের আবিষ্কারের ফলে আগামী দিনে বিরল রক্তের গ্রুপসম্পন্ন মানুষের রক্তদান সংক্রান্ত জটিলতা ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া অনেকটাই কমে আসবে।
সাধারণত মানুষের কাছে এ, বি, এবি এবং ও গ্রুপের রক্তই পরিচিত হলেও বিজ্ঞানীদের কাছে এখন পর্যন্ত ৪৭টি ব্লাড গ্রুপ সিস্টেমের খোঁজ রয়েছে, যার মধ্যে ৩৬০টি পরিচিত ব্লাড অ্যান্টিজেন বিদ্যমান। লোহিত রক্তকণিকার কোষে থাকা এই অ্যান্টিজেনের সামান্য তারতম্যের কারণে রক্তগ্রহীতার শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ১৯৭২ সালে প্রথম ‘অ্যান্টন’ এবং ‘ডব্লিউজে’ নামে দুই রোগীর শরীরে এই বিরল অ্যান্টিজেনের অনুপস্থিতি ধরা পড়ে, যা থেকে এর নামকরণ হয় ‘এএনডব্লিউজে’। তবে এতদিন এর নেপথ্যে কোন জিন কাজ করছিল, তা অজানা ছিল।
বিজ্ঞানীদের নতুন দিশা ও জিনের ভূমিকা
ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এক্সোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে ডিএনএর প্রোটিন-কোডিং অঞ্চল বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, মানুষের লোহিত রক্তকণিকায় ‘এমএএল’ নামক একটি ছোট মেমব্রেন প্রোটিন থাকে, যা মেমব্রেনের স্থিতাবস্থা বজায় রাখে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, পৃথিবীর ৯৯.৯ শতাংশ মানুষই এএনডব্লিউজে পজিটিভ এবং তাঁদের শরীরে এই প্রোটিনটি সম্পূর্ণভাবে বিদ্যমান। বিপরীতে, যাঁরা এএনডব্লিউজে নেগেটিভ, তাঁদের শরীরে এই প্রোটিনটি থাকে না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য বিজ্ঞানীরা লোহিত রক্তকণিকায় কৃত্রিমভাবে এমএএল জিন প্রবেশ করিয়ে এএনডব্লিউজে অ্যান্টিজেন উৎপাদন করতে সফল হয়েছেন।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রভাব
এতদিন জিনগত ভিত্তি অজানা থাকায় এএনডব্লিউজে নেগেটিভ রক্তের ধারকদের শনাক্ত করা অত্যন্ত জটিল ছিল। ফলে রক্ত নেওয়ার পর তাঁদের শরীরে নানা রকমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিত। নতুন এই আবিষ্কারের ফলে এখন খুব সহজেই বিরল রক্তের গ্রুপযুক্ত দাতা ও গ্রহীতাকে চেনা সম্ভব হবে। বিজ্ঞানীরা আরও জানতে পেরেছেন যে, এই রক্তের গ্রুপটি সবার ক্ষেত্রে জন্মসূত্রে আসে না। অনেক সময় ক্যানসার বা রক্তের কোনো মারাত্মক জটিলতার কারণে শরীরে এমএএল প্রোটিন তৈরি ব্যাহত হয়, যার ফলে মানুষ এএনডব্লিউজে নেগেটিভ হয়ে পড়ে। বর্তমানে বিশ্বে জন্মসূত্রে এই গ্রুপের অধিকারী মাত্র পাঁচ জন মানুষের সন্ধান মিলেছে, যাঁরা সকলেই একটি আরব-ইজ়রায়েলি পরিবারের সদস্য। তবে বিশ্বজুড়ে এমন আরও মানুষ থাকতে পারেন, যাঁদের এই আবিষ্কারের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।