পরমাণু ছাতায় জোটবদ্ধ হতে চলেছে তুরস্ক ও কাতার, পশ্চিম এশিয়ায় কি তৈরি হচ্ছে নতুন অক্ষ

পরমাণু ছাতায় জোটবদ্ধ হতে চলেছে তুরস্ক ও কাতার, পশ্চিম এশিয়ায় কি তৈরি হচ্ছে নতুন অক্ষ

পশ্চিম এশিয়ায় চলমান ইরান সংঘাত ও পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নতুন এক সামরিক সমীকরণের ইঙ্গিত মিলছে। পাকিস্তানের পরমাণু সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে উঠতে পারে ‘ইসলামীয় নেটো’। ইসলামাবাদ ও রিয়াধের মধ্যকার বিদ্যমান কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে এবার যুক্ত হতে চলেছে কাতার ও তুরস্ক। সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফের একটি সাক্ষাৎকার থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে, যা দক্ষিণ এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।

নতুন অক্ষের চার স্তম্ভ

পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, ইসলামাবাদ-রিয়াধ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তুরস্ক ও কাতারের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই জোটটি যদি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী চতুর্মুখী অক্ষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এই সম্ভাব্য জোটের চারটি প্রধান শক্তি হলো— তুরস্কের সুদীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা ও অত্যাধুনিক অস্ত্র নির্মাণের সক্ষমতা, পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, এবং সৌদি আরব ও কাতারের বিপুল খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও আর্থিক শক্তি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটির উপস্থিতি সত্ত্বেও ইরান সংকটের সময় ওয়াশিংটন সৌদি আরব বা কাতারকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই নিরাপত্তা ঘাটতি পূরণের তাগিদ এবং আঙ্কারার পুরনো অটোমান গৌরব ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই এই চার দেশ একজোট হওয়ার পরিকল্পনা করছে।

নয়াদিল্লির উদ্বেগ ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব

এই সম্ভাব্য সামরিক জোটের খবরে ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অতীতে কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার জবাবে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ সামরিক অভিযানের সময় তুরস্ক প্রকাশ্যেই পাকিস্তানকে ড্রোনসহ অন্যান্য সামরিক সহায়তা দিয়েছিল। ফলে এই অক্ষ পূর্ণতা পেলে ভারতের ওপর কৌশলগত চাপ বাড়বে। তবে প্রতিরক্ষাবিদদের মতে, ভারতের জন্য এটি তাৎক্ষণিক হুমকি না হলেও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলবে।

শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে ভারত ইতিমধ্যে গ্রিস, সাইপ্রাস ও আর্মেনিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি বাড়িয়েছে। পাশাপাশি, যৌথ সামরিক উৎপাদনের লক্ষ্যে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (UAE) সঙ্গে ‘কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারির রূপরেখা’ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে নয়াদিল্লি। একই সঙ্গে এই জোটে পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রের সম্পৃক্ততার আশঙ্কায় ইজ়রায়েলও তীব্র উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে, যা আগামী দিনে ভারত ও ইজ়রায়েলকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে।

বাস্তবায়নের পথে মূল চ্যালেঞ্জসমূহ

‘ইসলামীয় নেটো’ গঠনের পথে একাধিক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। প্রথমত, প্রস্তাবিত চারটি দেশের ওপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গভীর প্রভাব রয়েছে। তুরস্কের এই পদক্ষেপের কারণে ওয়াশিংটন তাকে মূল ‘নেটো’ থেকে বহিষ্কার করতে পারে এবং আঙ্কারার ওপর পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নেমে আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা এই ধরনের বড় সামরিক জোট পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় বাধা।

এ ছাড়া পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হলে এবং সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান চুক্তির শর্ত মেনে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি; বরং মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ফলে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এই জোট কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *