বিচ্ছেদের পর বিয়েতে ভীতি, সতর্ক হয়ে পা ফেলাতেই কি কাটবে আতঙ্ক

বিচ্ছেদের পর বিয়েতে ভীতি, সতর্ক হয়ে পা ফেলাতেই কি কাটবে আতঙ্ক

বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটির রূপ বদলেছে সময়ের সাথে। সমাজের চোখে এখন যেমন বিবাহ স্বাভাবিক, তেমনই স্বাভাবিক হয়েছে বিবাহবিচ্ছেদ এবং পরবর্তীতে পুনর্বিবাহ। কিন্তু আইনি বা সামাজিক প্রক্রিয়া সহজ হলেও, একটি সম্পর্ক ভাঙার পর সংশ্লিষ্ট মানুষের মনের ক্ষত শুকোতে দীর্ঘ সময় লাগে। বিবাহবিচ্ছেদের পর অনেকের মধ্যেই তৈরি হয় বিয়ের প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা বা ভীতি। সমীক্ষা এবং তারকাদের অভিজ্ঞতা বলছে, এই ভীতি কাটাতে নতুন প্রজন্ম এখন অনেক বেশি সতর্ক। কিন্তু অতিরিক্ত হিসাবনিকেশ বা সতর্কতা কি সত্যিই সুখের সংসারের নিশ্চয়তা দিতে পারে?

সমীক্ষার তথ্য ও বাস্তবতার ভিন্ন রূপ

সম্প্রতি বিবাহবিচ্ছিন্নদের পুনর্বিবাহের জন্য নির্মিত অ্যাপ ‘রিবাউন্স’-এর তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র। দেখা যাচ্ছে, প্রতি ৫ জনের মধ্যে ৩ জন বিবাহবিচ্ছিন্ন ব্যক্তি মনে করেন যে, প্রথম বিয়ের সময় যে সমস্যাগুলো তাঁদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল, এখন তা তাঁরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। ফলে দ্বিতীয়বার সম্পর্কে জড়ানোর আগে তাঁরা নিজেদের মনে একগুচ্ছ শর্ত বা সতর্কতার তালিকা তৈরি করে রাখছেন।

তবে বিনোদন জগতের তারকাদের অভিজ্ঞতা অবশ্য ভিন্ন কথা বলছে। অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তীর মতে, এই ধরনের শর্তের তালিকা তৈরি করে বাস্তবে খুব একটা লাভ হয় না। তিনি মনে করেন, এক ধরণের সমস্যা থেকে বাঁচতে গিয়ে মানুষ অন্য কোনো নতুন সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে মুম্বইয়ের টেলিভিশন অভিনেত্রী দলজিৎ কৌরের জীবনের ঘটনা উল্লেখ করা যায়। প্রথম স্বামীর বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসার অভিযোগ এনে ডিভোর্স দেওয়ার আট বছর পর তিনি ব্যবসায়ী নিখিল প্যাটেলকে বিয়ে করেন। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই স্বামীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে সেই সংসারও ভেঙে যায়। অর্থাৎ, একটি বিপদ থেকে বাঁচতে গিয়ে অন্য এক সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। সুদীপ্তার স্পষ্ট কথা, পছন্দের মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এত হিসাবনিকেশ কাজ করে না। আসল হলো দুটি মানুষের আত্মিক যোগাযোগ।

মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও তারকাদের দৃষ্টিভঙ্গি

সম্পর্কের ভাঙা-গড়া নিয়ে অভিনেতা ও পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায়ের পর্যবেক্ষণ কিছুটা আলাদা। তিনি দাম্পত্যের ক্ষেত্রে ‘বিপদসংকেত’ খোঁজার চেয়ে আবেগে বিশ্বাসী। তবে তিনি মনে করেন, দ্বিতীয়বার সম্পর্কে জড়ানোর আগে পার্টনারকে নিজের সম্পত্তি ভাবার মানসিকতা বর্জন করা এবং সম্পর্কে বন্ধুত্ব ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি, সম্পর্কে কোনো একজনের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা বা ‘ম্যানিপুলেশন’ অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।

অন্য দিকে, অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রের মতে, সম্পর্ক ভাঙার যন্ত্রণা বড্ড বেশি। তাই নতুন করে সম্পর্কে জড়াতে ভয় পাওয়া বা সতর্ক হওয়া অন্যায় নয়। বর্তমান প্রজন্মের ভাষায় যাকে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা বিপজ্জনক স্বভাব বলা হয়, তার কোনো শেষ নেই। তাই বলে মনের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে তিনি নন।

কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

মনোবিদদের মতে, বিয়ের এই ভীতি আসলে পুনরায় বিয়ে ভাঙার ভীতি এবং সমাজের কটূক্তির ভয়। আমাদের সমাজ যতই প্রগতিশীল হোক না কেন, বিবাহবিচ্ছেদের পর বিশেষ করে নারীদের অনেক বেশি সামাজিক ও মানসিক ক্লান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

মনোবিদ ঝুমা বসাক ও অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়ের মতে, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে সাবধান হওয়া ভালো, কারণ তা মানুষকে ‘না’ বলতে শেখায়। কিন্তু এই সাবধানতা যখন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায়, তখন মানুষ নতুন সঙ্গীকেও অতীতের চশমা দিয়ে দেখতে শুরু করে। ফলে সম্পর্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধা পায়। অতীতের ভয়কে জয় করে মনের জানালা খোলা না রাখলে, নতুন করে কারও সঙ্গে জুড়ে যাওয়ার বা সুখী হওয়ার সুযোগ চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *