সোনার দোকান থেকে রাজনীতির আঙিনায়, কীভাবে কসবার ত্রাস হয়ে উঠলেন সোনা পাপ্পু?
টানা ১০ ঘণ্টার ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের পর এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) হাতে গ্রেফতার হয়েছেন ঢাকুরিয়া ও কসবা এলাকার অন্যতম শীর্ষ অপরাধী বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পু। বালিগঞ্জের এক সাধারণ সোনার দোকানের মালিক থেকে শাসকদলের প্রভাবশালী ‘ভোট ম্যানেজার’ এবং পরবর্তীতে সিন্ডিকেট ও বেআইনি নির্মাণের বেতাজ বাদশা হয়ে ওঠার এই কাহিনি যেন কোনো রোমাঞ্চকর সিনেমাকেও হার মানায়। সোমবার তাঁর এই গ্রেফতারির পর কসবা ও ঢাকুরিয়া অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অপরাধ সাম্রাজ্যের এক অন্ধকার অধ্যায় প্রকাশ্যে এসেছে।
ব্যবসায়ীর আড়ালে অপরাধ সাম্রাজ্য
বালিগঞ্জ এলাকায় একটি সোনার দোকান ও রেস্তোরাঁ চালিয়ে নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিতেন বিশ্বজিৎ পোদ্দার। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতার অলিন্দে তাঁর অবাধ যাতায়াত শুরু হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ না নিলেও কসবা, ঢাকুরিয়া এবং রামলাল বাজার এলাকায় শাসকদলের মূল ‘ভোট ম্যানেজার’ হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনের সময়ে বিরোধীদের ঘর-বন্দি করে রাখা এবং বুথ দখলের মতো কাজে এই পাপ্পুকেই ব্যবহার করা হতো।
সিন্ডিকেট এবং বেআইনি নির্মাণের দাপট
শুধুমাত্র ভোট পরিচালনা নয়, ধীরে ধীরে কসবা ও ঢাকুরিয়া এলাকায় জমি দখল এবং সিন্ডিকেটের মূল হোতা হয়ে ওঠেন সোনা পাপ্পু। কলকাতা পৌরনিগমের ৬৭ এবং ৯১ নম্বর ওয়ার্ডে অন্তত ৫০-৫৫টি বেআইনি নির্মাণের নেপথ্যে তাঁর সরাসরি যোগসূত্রের অভিযোগ জমা পড়েছে। পুরনিগমের বিল্ডিং বিভাগের আধিকারিকরা সমস্ত বিষয় অবগত থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো পদক্ষেপ করতে পারতেন না। জয় কামদার এবং শান্তনু সিনহা বিশ্বাস নামের দুই ব্যক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে একটি চক্র গড়ে তুলেছিলেন পাপ্পু, যাদের মূল কাজই ছিল সাধারণ মানুষকে হুমকি দিয়ে জমি দখল করা এবং বহুতল নির্মাণের লভ্যাংশ ভাগ করে নেওয়া।
রাজনৈতিক যোগসূত্র ও প্রভাবের অবসান
সোশ্যাল মিডিয়ায় শাসকদলের শীর্ষ স্তরের একাধিক নেতার সঙ্গে সোনা পাপ্পুর ঘনিষ্ঠ ছবি তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপত্তির প্রমাণ দেয়। কসবার বিধায়ক জাভেদ খান থেকে শুরু করে দক্ষিণ কলকাতার জেলা সভাপতি দেবাশিস কুমার কিংবা স্থানীয় কাউন্সিলর বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। এই প্রবল রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণেই দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তবে ভুয়ো সংস্থার মাধ্যমে আর্থিক তছরুপ এবং লাগামহীন তোলাবাজির অভিযোগে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার এই পদক্ষেপের ফলে কসবার দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র ত্রাসের রাজত্বে বড়সড় ধাক্কা লাগল বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।