লাল সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘরে অমিত শাহের ঐতিহাসিক ঘোষণা, সম্পূর্ণ মাওবাদী মুক্ত ভারতবর্ষ!

লাল সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘরে অমিত শাহের ঐতিহাসিক ঘোষণা, সম্পূর্ণ মাওবাদী মুক্ত ভারতবর্ষ!

২০১০ সালের ৬ এপ্রিল ছত্তীসগড়ের বস্তারে মাওবাদীদের এক নৃশংস অতর্কিত হামলায় দেশের ৭৬ জন সিআরপিএফ জওয়ান শহিদ হয়েছিলেন। ভারতীয় সুরক্ষাবাহিনীর ইতিহাসে সেটিই ছিল মাওবাদীদের চালানো ভয়াবহতম হামলা। সেই ঘটনার পর থেকে দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘বস্তার’ নামটি দেশবাসীর কাছে রক্তক্ষয়ী হিংসা, আতঙ্ক এবং চরম অনগ্রসরতার সমার্থক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সোমবার সেই মাওবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল বা ‘হার্টল্যান্ড’ হিসেবে পরিচিত বস্তারের মাটিতে দাঁড়িয়েই এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, ভারতবর্ষ এখন সম্পূর্ণভাবে মাওবাদী ও নকশাল মুক্ত।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার খুব ভালভাবেই জানত যে, দেশ থেকে মাওবাদী আগ্রাসনের মূল উপড়ে ফেলতে গেলে লড়াইটা লড়তে হবে বস্তারের জंगलমহলেই। আর ঠিক সেই কারণেই ভারতের বুক থেকে নকশালবাদের এই চূড়ান্ত অবসানের কথা দেশবাসীকে জানাতে ছত্তীসগড়ের এই অঞ্চলকে বেছে নিলেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিগত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে মাওবাদী সন্ত্রাসের করাল গ্রাসে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রগতি সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে লাল সন্ত্রাসের ছায়ায় জীবন কাটানো ১৪ লক্ষ ১০ হাজার মানুষের জন্য এই ঘোষণা এক নতুন যুগের সূচনা করল। যা এক সময় ছিল চরম ভীতি ও রক্তপাতের প্রতীক, সরকারের সফল রণকৌশলের জেরে আজ সেই অঞ্চলটিই দেশের অন্যতম মস্ত বড় সাফল্যের খতিয়ান হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।

সাফল্যের নেপথ্যে কঠোর রণকৌশল

এই সাফল্য কিন্তু রাতারাতি আসেনি। ২০১৯ সাল থেকেই মোদী সরকার ‘নকশাল মুক্ত ভারত’ গড়ার লক্ষ্যে কোমর বেঁধে ময়দানে নেমেছিল। ২০২৩ সালে ছত্তীসগড়ে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই মাওবাদী বিরোধী অভিযান বহুগুণ তীব্র ও গতিশীল হয়ে ওঠে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ অভিযানে ২২৪ জন মাওবাদী খতম হয়েছিল। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যাটি এক ধাক্কায় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪০০-তে। শুধু তাই নয়, বিগত ১০ বছরে ১০ হাজারেরও বেশি সশস্ত্র নকশালপন্থী সরকারের কাছে নিজেদের অস্ত্র সমর্পণ করে মূল স্রোতে ফিরে এসেছে।

শাল, পিয়াল, সেগুন আর বাঁশের ঘন গভীর অরণ্যে ঘেরা বস্তারের ভৌগোলিক পরিবেশ বরাবরই দেশের সুরক্ষাবাহিনীর জন্য এক অত্যন্ত দুর্ভেদ্য ও কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। গত দুই দশকের খতিয়ান অনুযায়ী, মাওবাদীদের বুলেটে এ যাবৎ প্রায় ১,৩০০ সুরক্ষাকর্মী শহিদ হয়েছেন। এছাড়া ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মাওবাদীদের হাতে ১,৮০০-র বেশি নিরীহ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। একটা লম্বা সময় ধরে বস্তারের গ্রামগুলিতে সূর্য ডোবার পর ঘর থেকে বেরোনো অঘোষিতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।

ক্ষত নিরাময় ও আগামীর ব্লুপ্রিন্ট

দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র আন্দোলনের কারণে বস্তার ভারতের অন্যতম অনগ্রসর ও অনুন্নত অঞ্চল হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল। তবে মাওবাদীদের সেই একচ্ছত্র আধিপত্য এখন সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ। এবার সেই পুরনো ক্ষত কাটিয়ে অঞ্চলটিকে নতুন করে গড়ে তুলতে প্রয়োজন বিপুল অঙ্কের সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ। আর ঠিক এই কারণেই সোমবারের জনসভা ছাড়াও, মঙ্গলবার বস্তারের বুকেই আয়োজন করা হয়েছিল ২৬তম সেন্ট্রাল জোনাল কাউন্সিল বা কেন্দ্রীয় আঞ্চলিক পরিষদের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। যেখানে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগড় এবং উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীরা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন।

গত কয়েক বছর ধরে কেন্দ্র এখানে এক বিশেষ ‘ডুয়াল স্ট্র্যাটেজি’ বা দ্বিমুখী নীতি প্রয়োগ করেছিল। একদিকে যেমন মাওবাদীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে জঙ্গল সাফাই অভিযান চলেছে, ঠিক তেমনই অন্য প্রান্ত দিয়ে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় তৈরি হয়েছে মাইলের পর মাইল পাকা রাস্তা, বসেছে মোবাইল টাওয়ার, ঘরে ঘরে পৌঁছেছে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা, আধুনিক স্কুল ও বিশ্বমানের স্বাস্থ্যকেন্দ্র। নকশালবাদের বিষদাঁত সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার পর, সরকার এখন বস্তারকে কেবল মাত্র একটি ‘নিরাপত্তা মডেল’ হিসেবেই নয়, বরং দেশের সামনে এক অনন্য ‘উন্নয়ন মডেল’ বা ডেভলপমেন্ট মডেল হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *