পহেলগাঁও হামলার চার্জশিটে চাঞ্চল্যকর তথ্য, প্রকাশ্যে লস্কর সহযোগী TRF-এর তিন জঙ্গির নাম

জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁও উপত্যকায় ঘটে যাওয়া নৃশংস সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনায় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA)-র পেশ করা চার্জশিটে উঠে এলো একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রাথমিক তদন্ত ও নথিপত্র অনুযায়ী স্পষ্ট হয়েছে যে, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবার সহযোগী শাখা TRF (দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট) এই কাপুরুষোচিত হামলাটি চালিয়েছিল। হামলার পরপরই সংগঠনটি দায় স্বীকার করে বার্তা দিলেও, পরবর্তীতে আইনি জটিলতা এড়াতে তারা সেই বিবৃতি প্রত্যাহার করে নেয়।
তদন্তের হস্তান্তর ও তিন জঙ্গির পরিচয়
হামলার পর প্রাথমিক পর্যায়ে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ অনন্তনাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম হাসানের নেতৃত্বে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে জানা যায়, তিন জঙ্গি এই হামলায় সরাসরি জড়িত ছিল— ফয়জল জাট ওরফে সুলেমান, হাবিব তাহির ওরফে ছোটু এবং হামজা আফগানি। ঘটনার সাত দিন পর মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তের ভার এনআইএ-র হাতে তুলে দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় সংস্থাটির তদন্তে উঠে আসে এই হামলার মূল চক্রী বা মাস্টারমাইন্ডের নাম সাজ্জাদ জাট ওরফে আলি ভাই, যে সীমান্তপারের সম্পূর্ণ নীলনকশাটি তৈরি করেছিল।
দুর্গম পাহাড়ি পথ ও বৈসরণের ভৌগোলিক কৌশল
তদন্তের স্বার্থে এনআইএ-র বিশেষ দল বৈসরণের দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। বৈসরণ উপত্যকাটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, সেখান থেকে পুরো চত্বরের ওপর নজরদারি চালানো সহজ। প্রত্যন্ত এই পাহাড়ি এলাকায় কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকা এবং সরাসরি যাতায়াতের রাস্তা না থাকার সুযোগটিই নিয়েছিল জঙ্গিরা, যাতে হামলার পর সহজেই জঙ্গলে আত্মগোপন করা যায়। পরবর্তীতে ৩০ এপ্রিল নিরাপত্তা বাহিনী, ফরেনসিক দল ও অন্তর্ঘাত-বিরোধী শাখার যৌথ উদ্যোগে জঙ্গল জুড়ে একটি বিশাল তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। সিবিআই-এর তৈরি করা একটি থ্রিডি (3D) ম্যাপিং রিপোর্টের সাহায্যে জঙ্গিদের গতিবিধি ও আক্রমণের কৌশল নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেন তদন্তকারীরা।
সাক্ষীর বয়ানে পহেলগাঁও হামলার ক্রোনোলজি
তদন্ত প্রক্রিয়ায় গতি আনতে এনআইএ স্থানীয় দোকানদার, ট্যাক্সি চালক ও ঘোড়সওয়ারসহ মোট ১,১১৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এর মধ্যে এক অজ্ঞাতপরিচয় সাক্ষীর বয়ান মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই সাক্ষীর বয়ান অনুযায়ী হামলার ক্রোনোলজি বা ঘটনাক্রম নিচে দেওয়া হলো:
- হামলার আগের দিন: সাক্ষী স্থানীয় বাসিন্দা ওয়াশির আহমেদকে তিনজন সশস্ত্র অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির (জঙ্গি) সঙ্গে ঘোরাফেরা করতে দেখেন।
- ২২ মে (সকাল): বৈসরণ পার্কে ওয়াশির এবং পারভেজ নামের দুই সন্দেহভাজনকে একসঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়।
- ২২ মে (দুপুর/কয়েক ঘণ্টা পর): আচমকাই বৈসরণ চত্বরে প্রথম গুলি চালায় জঙ্গি ফয়জল জাট ওরফে সুলেমান। এর পরই চারদিকে তীব্র আতঙ্ক ছড়ায় এবং গুলিবর্ষণের খবর আসে।
- হামলার পর: পালানোর সময় জঙ্গিরা ওই সাক্ষীকে ধরে ফেলে এবং পরিচয় নিশ্চিত করতে ‘কলমা’ পাঠ করতে বলে। কলমা পাঠ করার পর ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত করেই তাকে জীবিত ছেড়ে দেওয়া হয়।
এক ঝলকে
- পহেলগাঁও হামলার তদন্তে লস্কর-ই-তৈবার সহযোগী সংগঠন TRF-এর তিন জঙ্গি সুলেমান, ছোটু ও হামজা আফগানির নাম চার্জশিটে প্রকাশ করল NIA।
- হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বা মাস্টারমাইন্ড সাজ্জাদ জাট ওরফে আলি ভাই বলে তদন্তে নিশ্চিত করা হয়েছে।
- ঘটনার রহস্যভেদে সিবিআই-এর থ্রিডি (3D) ম্যাপিংয়ের সাহায্য নেওয়া হয়েছে এবং ১,১১৩ জন স্থানীয় বাসিন্দাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
- এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর বয়ান অনুযায়ী, ঘটনার দিন প্রথমে গুলি চালিয়েছিল সুলেমান এবং জঙ্গিরা তাকে আটকে কলমা পাঠ করিয়ে ছেড়ে দেয়।