অনুপস্থিতির জোড়া ধাক্কায় বিপর্যস্ত তৃণমূল, ভাঙনের মেঘ কি ঘনীভূত হচ্ছে?

মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দুই শতাধিক আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফেরা তৃণমূল কংগ্রেস ২০২৬ সালের নির্বাচনে ক্ষমতা হারিয়ে এখন গভীর সংকটে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর বিরোধী আসনে বসার পর দলীয় কর্মসূচিতে নিজেদের জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিত করাই এখন নেতৃত্বের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিধানসভা থেকে শুরু করে কলকাতা পুরসভা (কেএমসি)—সব জায়গাতেই দলের জনপ্রতিনিধিদের এই ব্যাপক অনুপস্থিতি তৃণমূলের অন্দরে এক অভূতপূর্ব অস্বস্তি ও সাংগঠনিক শিথিলতা তৈরি করেছে।
বিধানসভা থেকে পুরসভা, সর্বত্রই ভাঙা হাট
সম্প্রতি বিধানসভা চত্বরে ভোট-পরবর্তী হিংসা ও নতুন সরকারের প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তৃণমূলের প্রথম বড় কর্মসূচিতে দলের চরম সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। নির্বাচনে জয়ী মাত্র ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে সেদিন উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৩৪ জন। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি বিধায়ক দলের প্রথম বড় কর্মসূচিতে যোগ দেননি।
অনুরূপ এক অস্বস্তিকর চিত্র দেখা গেছে কলকাতা পুরসভাতেও। নির্ধারিত মাসিক অধিবেশনে বিকল্প ঘরে বসা দলীয় বৈঠকে তৃণমূলের ১৩৭ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ৪১ জনই অনুপস্থিত ছিলেন, যার মধ্যে অন্যতম বড় নাম চিফ হুইপ বাপাদিত্য দাশগুপ্ত। দলীয় হুইপ জারি থাকা সত্ত্বেও এত বিপুল সংখ্যক কাউন্সিলরের অনুপস্থিতি পুরবোর্ডের অন্দরে তীব্র অসন্তোষ বা সম্ভাব্য মতপার্থক্যকে সামনে এনে দিয়েছে।
কারণ ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব
তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশ এই অনুপস্থিতির পক্ষে যুক্তি দিয়ে দাবি করেছেন যে, ভোট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকায় আক্রান্ত কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে ব্যস্ত রয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুক্তি সম্পূর্ণ সত্য নয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর হঠাৎ বিরোধী আসনে বসার ধাক্কা দল এখনো সামলে উঠতে পারেনি। দলীয় শৃঙ্খলায় বড়সড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং ক্ষমতা হারানোর পর অনেক জনপ্রতিনিধিই হয়তো বর্তমান শাসকদলের ভয়ে বা নতুন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের খোঁজে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন।
জনপ্রতিনিধিদের এই ধারাবাহিক অনুপস্থিতি আগামী দিনে তৃণমূলের রাজনৈতিক অস্তিত্বের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিধানসভা ও পুরসভায় দলের শক্তি হ্রাস পেলে বিরোধী দল হিসেবে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা হারাবে তৃণমূল। এই সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতা যদি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা না যায়, তবে মাঠের রাজনীতিতে যেমন কর্মীবাহিনী মনোবল হারাবে, তেমনই দলের অভ্যন্তরে বড় ধরনের ভাঙন বা নিষ্ক্রিয়তা গ্রাস করার আশঙ্কা আরও জোরালো হবে।