আইনি ব্যাখ্যার জটিলতায় পথকুকুরদের ‘মৃত্যুদণ্ড’ নয়, সরব টলিপাড়া

সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে পথকুকুরদের সুরক্ষার বিষয়টি নতুন করে বিতর্কের মুখে পড়েছে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, কোনো পথকুকুর যদি ‘পাগল’ হয়ে যায় কিংবা অতিরিক্ত হিংস্র আচরণ করে, তবে তাকে মেরে ফেলা যেতে পারে। এই নির্দেশের পর থেকেই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের পশুপ্রেমী ও পরিবেশবাদীরা। এরই মধ্যে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মান রাস্তা থেকে হিংস্র পথকুকুর নির্মূল করার ঘোষণা দেওয়ায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। এ নিয়ে কলকাতার বিনোদন জগতের প্রথম সারির দুই পশুপ্রেমী ব্যক্তিত্ব, অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র ও পরিচালক-অভিনেতা তথাগত মুখোপাধ্যায় তাঁদের তীব্র আপত্তি ও উদ্বেগ জানিয়েছেন।
আইনের অপব্যাখ্যা ও পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা
টলিউডের অন্যতম পরিচিত পশুপ্রেমী শ্রীলেখা মিত্রের মতে, শীর্ষ আদালতের এই ঐতিহাসিক নির্দেশের সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট জানান যে, গুরুতর অসুস্থ বা রেবিস আক্রান্ত কুকুরদের চিকিৎসার মাধ্যমে চিরঘুমে (ইউথেনেশিয়া) পাঠিয়ে দেওয়ার নিয়ম আগে থেকেই ছিল এবং তার জন্য পশুচিকিৎসকের আইনি অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। পাঞ্জাবে যেভাবে গণহারে কুকুর নির্মূলের তৎপরতা শুরু হয়েছে, তাকে পশুর প্রতি মানুষের মজ্জাগত হিংসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখছেন তিনি। শ্রীলেখার যুক্তি, কোনো প্রাণীই অকারণে মানুষকে আক্রমণ করে না। মানুষ যেমন খালি পেটে মেজাজ হারায়, কুকুরদের ক্ষেত্রেও পেটের ক্ষিদে বা অতীতে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া আঘাতের আতঙ্ক তাদের রক্ষণাত্মক ও হিংস্র করে তোলে। উপযুক্ত পুনর্বাসন ও চিকিৎসার সুযোগ থাকতে অবোলা প্রাণীদের ওপর এমন অত্যাচার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মানদণ্ড নির্ধারণের অভাব ও অমানবিক সিদ্ধান্ত
কোন কুকুরটি ঠিক কতটা হিংস্র বা পাগল, তা নির্ধারণ করার সঠিক মাপকাঠি কী হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায়। মানুষের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছামৃত্যুর আইন থাকলেও, মুখহীন ও নির্বাক প্রাণীদের ক্ষেত্রে ‘ইউথেনেশিয়া’ শব্দটির প্রয়োগকে তিনি অত্যন্ত অমানবিক ও হাস্যকর বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে সভ্য সমাজে একটি অসুস্থ প্রাণীকে মেরে ফেলা চরম নিষ্ঠুরতা। আইনি সুরক্ষার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তথাগত জানান, সরকারি নির্দিষ্ট সংস্থা ছাড়া সাধারণ মানুষের পশুদের ওপর আঘাত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে আইনের ফাঁক গলে কিছু মানুষ যে এর অপব্যবহার করবে, সেই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতিতে পশু অধিকার সংক্রান্ত আইনি অভিযোগের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছুটা আশার আলো দেখছেন তথাগত। তিনি মনে করেন, পথকুকুরদের সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ককে আইনি ফতোয়া দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয় এবং নিষ্ঠুরতার পক্ষে কোনো আইন হতে পারে না। এই অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে প্রয়োজনে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন এই টলি-তারকারা।