তালাবন্ধ হাউস, ক্লাব রুমেই ‘অধিবেশন’ কাউন্সিলারদের! বেনজির ঘটনার সাক্ষী কলকাতা পুরসভা

কলকাতা পুরসভার (KMC) ইতিহাসে নজিরবিহীন ও চরম নাটকীয় ঘটনার সাক্ষী থাকল সেন্ট্রাল মিউনিসিপ্যাল বিল্ডিং। পুরসভার চেয়ারপার্সন মালা রায়ের সঙ্গে নতুন পুরসচিব কিশোরকুমার বিশ্বাসের ‘চূড়ান্ত অসহযোগিতা’ এবং অধিবেশন কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার রণক্ষেত্রের চেহারা নিল পুর চত্বর। শেষ পর্যন্ত মূল অধিবেশন কক্ষ বন্ধ থাকায় ক্ষুব্ধ চেয়ারপার্সন তৃণমূলের ৯৬ জন কাউন্সিলারকে নিয়ে ‘কাউন্সিলারস ক্লাব রুম’-এই মাসিক অধিবেশন সারলেন। আর সেই ক্লাবের ভেতরেই খোদ পুর-কমিশনারের বিরুদ্ধে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হলো মুলতবি প্রস্তাব।
অধিবেশন বাতিল ঘিরে সংঘাতের সূত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার, যখন চেয়ারপার্সন মালা রায়কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে পুর সচিবালয় থেকে আচমকা শুক্রবারের নির্ধারিত মাসিক অধিবেশন বাতিলের নির্দেশিকা জারি করা হয়। তৃণমূল কাউন্সিলারদের অভিযোগ, নবগঠিত রাজ্য সরকারের ইঙ্গিতেই পুর-কমিশনার নির্বাচিত বোর্ডকে এড়িয়ে পুরসভা চালাতে চাইছেন।
শুক্রবার সকালে পুরসভার নতুন সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন কিশোরকুমার বিশ্বাস। নির্দেশিকা অগ্রাহ্য করে চেয়ারপার্সন মালা রায়, মেয়র ফিরহাদ হাকিম এবং অতীন ঘোষ সহ তৃণমূলের বহু কাউন্সিলার পুরসভায় হাজির হন। মালা রায় সচিবকে চিঠি দিয়ে স্পষ্ট জানান, পুর আইন অনুযায়ী অধিবেশন ডাকা বা বাতিলের একচ্ছত্র অধিকার একমাত্র চেয়ারপার্সনের। এরপর সচিবকে ডেকে পাঠানো হলেও তিনি না আসায় মেয়র পারিষদ বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় ও মিতালি বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কাউন্সিলাররা সচিবের ঘরে গিয়ে তুমুল বিক্ষোভ দেখান। সচিব স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তিনি অধিবেশন কক্ষের তালা খুলতে পারবেন না।
ক্লাব রুমেই বিকল্প ‘হাউস’
মূল অধিবেশন কক্ষের চাবি না মেলায় বিকল্প পথ বেছে নেন চেয়ারপার্সন। কাউন্সিলারস ক্লাবের ভেতর থেকে চেয়ার-টেবিল সরিয়ে সেটিকে অস্থায়ী অধিবেশন কক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। সেখানে কাউন্সিলার সংহিতা দাস পুর-কমিশনারের বিরুদ্ধে মুলতবি প্রস্তাব আনেন। প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য রাখেন ফিরহাদ হাকিম ও বিশ্বরূপ দে।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে চেয়ারপার্সন মালা রায় বলেন, “চেয়ারপার্সনকে এড়িয়ে অধিবেশন বাতিলের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বেআইনি। উনি কক্ষ খোলেননি, তাই আমরা বাইরেই নিয়ম মেনে অধিবেশন করেছি।” অন্যদিকে মেয়র ফিরহাদ হাকিম গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন:
“এই পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখের। নির্বাচিত বোর্ডকে যদি এভাবে অবজ্ঞা করা হয়, তবে পুরসভায় সাংবিধানিক সংকট দেখা দেবে। আমি রাজ্য সরকারকে বলব, সংঘাত নয়, মানুষের স্বার্থে কাজ করতে হবে।”
বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, বোর্ড ভাঙার হুঁশিয়ারি বিজেপির
তৃণমূল ক্লাব রুমে অধিবেশন করলেও এর আইনি বৈধতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে। যেহেতু সচিব আগেই নোটিস দিয়ে এটি বাতিল করেছিলেন, তাই এই অধিবেশনের বিবরণী পুরসভার অফিশিয়াল খাতায় লিপিবদ্ধ হবে না। বাম কাউন্সিলার মধুছন্দা দেব এই ঘটনাকে ‘অকাম্য’ বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্য দিকে, এই ‘বিকল্প অধিবেশন’-কে সম্পূর্ণ বেআইনি দাবি করে পুর-কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে বিজেপি। বিজেপির সজল ঘোষ, মীনাদেবী পুরোহিত ও বিজয় ওঝারা পাল্টা সরব হয়েছেন। সজল ঘোষ তীব্র আক্রমণ শানিয়ে বলেন:
“পুরসভায় এই ধরণের নাটক চলতে পারে না, এতে পুরসভার মর্যাদাহানি হয়েছে। আমরা খবর পেয়েছি নতুন সচিবকে হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং পুরসভা থেকে ফাইল লোপাটের চেষ্টা চলছে। আমরা পুরমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ জানাচ্ছি, প্রয়োজনে এই পুরবোর্ড ভেঙে দিয়ে অ্যাডমিনিস্ট্রেটর (প্রশাসক) বসানো হোক।”
এই ঘটনা প্রসঙ্গে রাজ্যের পৌর বিষয়ক মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, নবনিযুক্ত সচিব হেনস্থার শিকার হয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন। এই ধরণের আচরণ কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য তিনি কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে (নগরপাল) জানাবেন। অন্যদিকে, অধিবেশন কক্ষ না খোলার অভিযোগে মালা রায় ও চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যরা নিউ মার্কেট থানায় সচিব ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে ডায়েরি করেছেন।
এক ঝলকে
- চেয়ারপার্সনকে না জানিয়ে অধিবেশন বাতিলের নোটিস এবং মূল কক্ষে তালা ঝোলানোয় নজিরবিহীন সংঘাত কলকাতা পুরসভায়।
- তালাবন্ধ কক্ষের বাইরে কাউন্সিলারস ক্লাব রুমে বিকল্প অধিবেশন ডেকে পুর-কমিশনারের বিরুদ্ধে মুলতবি প্রস্তাব পাশ করালেন তৃণমূলের ৯৬ জন কাউন্সিলার।
- অধিবেশন কক্ষ না খোলায় নিউ মার্কেট থানায় অভিযোগ দায়ের তৃণমূলের, অন্যদিকে সচিবকে হুমকির অভিযোগে সরব বাম-বিজেপি।
- পুরসভার মর্যাদাহানির অভিযোগ তুলে অবিলম্বে বর্তমান পুরবোর্ড ভেঙে দিয়ে প্রশাসক বসানোর দাবি জানিয়েছেন বিজেপি নেতা সজল ঘোষ।