ভারমুক্ত শৈশবের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, বাংলার স্কুলশিক্ষায় আসছে আমূল বদল

ভারমুক্ত শৈশবের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, বাংলার স্কুলশিক্ষায় আসছে আমূল বদল

বাংলার স্কুলশিক্ষার খোলনলচে বদলে দিতে একগুচ্ছ যুগান্তকারী নির্দেশিকা জারি করল শিক্ষা দফতর। শিক্ষাক্ষেত্রে সাম্প্রতিক প্রশাসনিক রদবদলের পর এবার সরাসরি পড়ুয়াদের ওপর থেকে পড়াশোনার মানসিক ও শারীরিক চাপ কমাতেই এই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন এই নিয়মে একদিকে যেমন স্কুলব্যাগের ওজন নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে তেমনই কমানো হয়েছে হোমওয়ার্ক বা বাড়ির কাজের বোঝাও। শিক্ষা দফতরের এই পদক্ষেপকে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

কমে যাচ্ছে স্কুলব্যাগের ওজন

দীর্ঘদিন ধরেই স্কুলপড়ুয়াদের পিঠে ভারী ব্যাগের বোঝা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন অভিভাবক ও চিকিৎসকেরা। নতুন নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, স্কুলব্যাগের ওজন কোনোভাবেই শিক্ষার্থীর শরীরের মোট ওজনের ১০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। এই নিয়ম অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিশুদের কোনো ব্যাগ নিয়েই স্কুলে যেতে হবে না। অন্যান্য শ্রেণির জন্য ব্যাগের সর্বোচ্চ ওজনসীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ক্ষেত্রে ব্যাগের ওজন হবে ১.৬ থেকে ২.২ কেজি। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ১.৭ থেকে ২.৫ কেজি, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে যথাক্রমে ২ কেজি ও ৩ কেজি এবং অষ্টম শ্রেণিতে ২.৫ থেকে ৪ কেজি ওজন নির্ধারিত হয়েছে। একইভাবে নবম ও দশম শ্রেণির ব্যাগের ওজন ২.৫ থেকে ৪.৫ কেজি এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির জন্য তা ৩.৫ থেকে ৫ কেজির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এ ছাড়া পড়ুয়াদের বাড়ি থেকে টিফিন আনার অভ্যাসে রাশ টেনে মিড-ডে মিলের ওপর বেশি জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

হোমওয়ার্কেও বড় কাটছাঁট

শুধু ব্যাগের ওজনই নয়, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ মুক্ত রাখতে বাড়ির কাজের ক্ষেত্রেও কড়া সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পড়ুয়াদের কোনো হোমওয়ার্ক দেওয়া যাবে না। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির ক্ষেত্রে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা (সপ্তাহে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা) হোমওয়ার্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, উঁচু ক্লাসের অর্থাৎ নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়ারা প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা (সপ্তাহে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা) বাড়ির কাজ পাবে।

কারণ ও দূরগামী প্রভাব

মূলত শৈশব ও কৈশোরে অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ এবং ভারী ব্যাগের কারণে পড়ুয়াদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছিল। পিঠ ও কোমরের ব্যথা সহ নানাবিধ শারীরিক সমস্যা তৈরি হওয়া এবং খেলার মাঠ থেকে শিশুদের দূরে চলে যাওয়ার প্রবণতা রুখতেই এই নীতিগত পরিবর্তন। শিক্ষা দফতরের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় বাড়তি আনন্দ পাবে এবং তাদের স্বাভাবিক বিকাশ ত্বরান্বিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। নতুন এই নির্দেশিকা দ্রুত কার্যকর করার জন্য স্কুল স্তরে নজরদারিও বাড়ানো হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *