‘কচ্ছপদের ভালো রাখুন, ঝামেলা দেখলে খোলসে ঢুকুন’! তৃণমূলের ভরাডুবির পর কুণাল ঘোষের ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্টে তোলপাড়

‘কচ্ছপদের ভালো রাখুন, ঝামেলা দেখলে খোলসে ঢুকুন’! তৃণমূলের ভরাডুবির পর কুণাল ঘোষের ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্টে তোলপাড়

রাজারহাটের বুথ বিতর্ক, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিবাদী কবিতা ‘দখল’ এবং ছোটপর্দায় রুবেল-শ্বেতা জুটির কামব্যাকের মেগা খবরের মাঝেই, বাংলার রাজনৈতিক মহলে ফের এক ডিগবাজি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বোমা ফাটল। ছাব্বিশের মেগা বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের নজিরবিহীন ভরাডুবির পর যখন দলের অন্দরমহল তোলপাড়, ঠিক তখনই নিজের চেনা মেজাজে এক চরম ইঙ্গিতপূর্ণ ও রহস্যময় সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট করলেন তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক তথা অন্যতম প্রধান মুখ কুণাল ঘোষ। ফেসবুকে তাঁর এই ‘কচ্ছপ তত্ত্ব’ সামনে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনার পারদ চড়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, নাম না করে দলেরই একঝাঁক ‘সুবিধাবাদী’ ও ‘বিপদের দিনে চুপ থাকা’ প্রবীণ বা শীর্ষ স্তরের নেতাকে তীব্র খোঁচা দিয়েছেন কুণাল।

বিগত বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশল এবং ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ হেল্পলাইনের ব্যর্থতা নিয়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক আদালত-ভাষণের সমান্তরালেই, কুণাল ঘোষের এই পোস্ট ঘাসফুল শিবিরের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভকে পুরোপুরি প্রকাশ্যে এনে দিল।

কী লিখেছেন কুণাল ঘোষ? সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘কচ্ছপ’ নীতি

শনিবার বিকেলে কুণাল ঘোষ তাঁর অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে কচ্ছপদের দীর্ঘায়ু ও তাদের জীবনযাত্রার ধরণকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে এক তীক্ষ্ণ শ্লেষাত্মক পোস্ট করেন। তাঁর সেই ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্টের হুবহু ছত্রে ছত্রে যা লেখা রয়েছে:

“কচ্ছপদের ভালো রাখুন। ওরা দীর্ঘদিন বাঁচে, অনেক বয়স পর্যন্ত। সিনিয়রিটিকে সম্মান দিয়ে চলুন। তাঁদের দেখে শিখুন। খোলসটা ব্যবহার করুন। ঝামেলা দেখলে খোলসে ঢুকে থাকুন। খোলসের ভিতর থেকে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করুন। বাইরের ঝামেলা একটু কমলে খোলস থেকে বেরন। আগে মুখ বাড়িয়ে দেখে নিন কোন দিকে হাঁটবেন। তারপর সুবিধেমতো চলুন।”

কাদের খোঁচা দিলেন কুণাল? উঠছে বড় প্রশ্ন

কুণাল ঘোষের এই পোস্টের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ নেটনাগরিকদের মনে একটাই প্রশ্ন— ঠিক কাদের উদ্দেশ্যে এই নজিরবিহীন আক্রমণ শানালেন তিনি? পোস্টের শব্দবন্ধগুলি বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক অলিন্দে মূলত তিনটি সমীকরণ উঠে আসছে:

  • সুবিধাবাদী ও নিষ্ক্রিয় প্রবীণ নেতৃত্ব: কুণাল লিখেছেন ‘সিনিয়রিটিকে সম্মান দিয়ে চলুন’। এর মাধ্যমে তিনি দলের সেই সমস্ত প্রবীণ ও শীর্ষনেতাদের নিশানা করেছেন, যাঁরা ভোটের ময়দানে বা দলের কঠিন সময়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই না করে নিজেদের আড়ালে রেখেছিলেন।
  • ‘খোলসে ঢুকে থাকা’ সোশ‍্যাল মিডিয়া যোদ্ধা: ভোটের আগে বা পরে যখন দল চরম সংকটে, তখন মাঠে-ঘাটে না নেমে যাঁরা কেবল খোলসের ভেতর অর্থাৎ এসি ঘরে বসে সোশ্যাল মিডিয়ায় জ্ঞান দিচ্ছেন বা নিজেদের নিরাপদ রাখছেন, তাঁদের ‘খোলস নীতি’কে তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন কুণাল।
  • সুবিধামতো দলবদল বা অবস্থান পরিবর্তন: ‘আগে মুখ বাড়িয়ে দেখে নিন কোন দিকে হাঁটবেন, তারপর সুবিধেমতো চলুন’— এই লাইনের মাধ্যমে কুণাল ঘোষ সেই সমস্ত নেতাদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন, যাঁরা হাওয়া কোন দিকে বইছে তা দেখে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেন বা নব্য শাসকদলের সাথে গোপন আঁতাত রাখছেন।

পার্থর পর কুণাল, ছাব্বিশের হারে ছন্নছাড়া ঘাসফুল শিবির

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন ভাটপাড়া ও হালিশহরে পুরবোর্ড রক্ষা করতে কালীঘাটে ড্যামেজ কন্ট্রোল বৈঠক চলছে এবং অন্যদিকে বরাহনগরে তোলাবাজি ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে তৃণমূল নেতা শঙ্কর রাউত পুলিশের জালে ধরা পড়ছেন— সেই অত্যন্ত উত্তপ্ত আবহে কুণাল ঘোষের এই ‘কচ্ছপ পোস্ট’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দলের বিপর্যয়ের দিনে কারচুপি বা ইভিএমের দোহাই না দিয়ে, দলের ভেতরের আসল ‘শত্রু’ বা সুবিধাবাদীদের চিহ্নিত করতেই কুণাল এই পোস্টের আশ্রয় নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূলের অন্দরে প্রবীণ বনাম নবীন এবং অনুগত বনাম সুবিধাবাদীদের এই লড়াই আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *