মূর্তি ভাঙা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী! যুবভারতীর ‘নকশা’ বদল ঘিরে তপ্ত রাজ্য রাজনীতি

মূর্তি ভাঙা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী! যুবভারতীর ‘নকশা’ বদল ঘিরে তপ্ত রাজ্য রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিনিধি: সল্টলেকের বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের প্রবেশদ্বারের সামনে থাকা প্রতীকী ফুটবল ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলাকে কেন্দ্র করে এবার রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন সংঘাতের সূচনা হলো। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের ‘বুলডোজার অভিযান’ ও পরিকাঠামো বদলের নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে এটিকে তাঁর ব্যক্তিগত সৃষ্টি এবং ক্রীড়াপ্রেমীদের আবেগের ওপর আঘাত বলে তোপ দেগেছেন, ঠিক তেমনই বর্তমান ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক এই স্থাপত্যকে ‘বিদঘুটে’ আখ্যা দিয়ে নান্দনিকতা ফেরানোর পক্ষে সওয়াল করেছেন।

নিজের আঁকা নকশা ভাঙায় ক্ষুব্ধ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী

রবিবার এক ফেসবুক লাইভ ভিডিও বার্তায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যুবভারতীর সামনের মূর্তিটি ভেঙে ফেলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, এই মূর্তির মূল নকশা বা ডিজাইনটি তিনি নিজেই তৈরি করেছিলেন এবং তাঁর সেই ভাবনার ওপর ভিত্তি করেই শিল্পীরা এটি গড়ে তোলেন।

তৃণমূল নেত্রী বলেন, “ওই মূর্তিটি আমাদের রাজ্যের ক্রীড়াপ্রেমীরা খুব পছন্দ করতেন। এমনকি অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল বিশ্বকাপের সময় যখন ফিফা (FIFA) প্রতিনিধিরা এসেছিলেন, তাঁরাও এর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। তোমাদের আমার ওপর রাগ থাকতে পারে, কিন্তু স্থাপত্যের ওপর কেন? তোমরা কি সব জায়গা থেকে আমাদের স্মৃতি ভেঙে দিয়ে নিজেদের মূর্তি লাগাবে?”

মূর্তির নেপথ্য ইতিহাস ও বিশ্ববাংলা বিতর্ক

২০১৭ সালে কলকাতায় যখন ফিফা অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়, তখন যুবভারতী স্টেডিয়ামের মূল প্রবেশদ্বারের সামনে এই ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছিল। একজন ফুটবলারের প্রতীকী অবয়বের সঙ্গে সেখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল তৎকালীন তৃণমূল সরকারের ব্র্যান্ড ‘বিশ্ববাংলা’র লোগো। তবে স্থাপনের সময় থেকেই ক্রীড়ামহলে এটি নিয়ে মৃদু বিতর্ক ছিল। ফুটবলপ্রেমীদের একাংশের দাবি ছিল, যুবভারতীর মতো ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামের বাইরে কোনো কাল্পনিক বা প্রতীকী নকশার বদলে পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়, চুনী গোস্বামী বা শৈলেন মান্নার মতো বাংলার কোনো কিংবদন্তি ফুটবলারের মূর্তি থাকা উচিত ছিল।

‘বিদঘুটে’ মূর্তি সরানোর ব্যাখ্যা ক্রীড়ামন্ত্রীর

কয়েক দিন আগেই যুবভারতী স্টেডিয়াম পরিদর্শনে যান রাজ্যের নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। সেখানে মূর্তিটি দেখে তিনি সেটিকে ‘বিদঘুটে’ বলে কটাক্ষ করেন এবং সাফ জানান, “এই মূর্তির কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ নেই এবং এটি স্টেডিয়ামের নান্দনিক সৌন্দর্য নষ্ট করছিল।” ক্রীড়ামন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরপরই প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে মূর্তিটি ভেঙে ফেলে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্টেডিয়াম চত্বরের আধুনিকীকরণ, নান্দনিকতা ফিরিয়ে আনা এবং উন্নয়নের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই।

উচ্ছেদ ও বুলডোজার নীতি নিয়ে তোপ মমতার

মূর্তি ভাঙার প্রসঙ্গ ছাড়াও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের হকার উচ্ছেদ, বেআইনি নির্মাণ ভাঙা এবং তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় দখল বা ভেঙে দেওয়ার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, কোনো আগাম নোটিস বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই মানুষের রুজি-রোজগারে আঘাত হানা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুবভারতীর মূর্তিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক কেবল একটি স্থাপত্য ভাঙার বিষয় নয়, বরং এটি আসলে বাংলার সংস্কৃতি ও ক্ষমতার রাশ নিজেদের হাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূল ও বিজেপির রাজনৈতিক আধিপত্য লড়াইয়ের এক নতুন ক্ষেত্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *