ওবিসি তালিকা স্ক্রিনিংয়ে ৪ মাসের ডেডলাইন, শুভেন্দু সরকারের বড় পদক্ষেপে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি!

ক্ষমতায় আসার পরেই রাজ্যে ওবিসি (অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি) সংরক্ষণ নীতিতে আমূল পরিবর্তনের পথে হেঁটেছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নতুন সরকার। এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে দেওয়া ওবিসি শংসাপত্রগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে আরও একধাপ এগোল নবান্ন। সোমবার নবান্নের ১৪ তলায় শিলিগুড়ি, পুরুলিয়া, বর্ধমান, উত্তর ২৪ পরগনা সহ একাধিক জেলার ২৬ জন বিধায়ককে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই বৈঠকেই রাজ্যের ওবিসি তালিকা পুনর্বিবেচনা ও নতুন করে সমীক্ষাকার্য চালানোর জন্য বিধায়কদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এই কাজের জন্য নির্দিষ্টভাবে ৪ মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল আগেই স্পষ্ট করেছিলেন যে, ২০১১ সালের পর থেকে রাজ্যে যত ওবিসি শংসাপত্র দেওয়া হয়েছে, বিশেষত যেগুলি ‘দুয়ারে সরকার’ ক্যাম্পের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে যাচাই করা হবে। সোমবারের বৈঠকে সেই সিদ্ধান্তকেই বাস্তবায়িত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি এলাকার বিধায়কদের নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে নতুন করে একটি বিশেষ সার্ভে বা সমীক্ষা চালাতে হবে। আগামী ৪ মাসের মধ্যে এই সমীক্ষা শেষ করে কে কোন জাতি বা উপজাতির অন্তর্ভুক্ত, তার একটি নিখুঁত ও স্বচ্ছ তালিকা তৈরি করে জমা দিতে হবে সরকারের কাছে।
সংরক্ষণের রাশ টানার নেপথ্য কারণ
শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে ওবিসি সংরক্ষণ নীতিতে বড়সড় রদবদল আনা হয়। বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে ওবিসি সংরক্ষণ ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৭ শতাংশ করা হয়েছিল, যার বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন গোষ্ঠী। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য চালু থাকা ওবিসি সংরক্ষণ আপাতত সম্পূর্ণ বাতিলের ঘোষণা করেছে এবং সংরক্ষণের কোটা ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে পুনরায় আগের মতো ৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। মূলত বিগত সরকারের আমলে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে আইনি বৈধতা ও স্বচ্ছতার অভাব ছিল বলেই মনে করছে বর্তমান শাসকদল। এই নিয়ে জল বহুদূর গড়িয়েছিল, এমনকি কলকাতা হাইকোর্টও ২০১০ সালের পর জারি করা সমস্ত ওবিসি শংসাপত্র বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত পৌঁছায়।
প্রশাসনিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রভাব
সরকারের এই ৪ মাসের ডেডলাইন এবং ওবিসি সার্টিফিকেট পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে চলেছে। প্রথমত, এই পুনর্বিবেচনার ফলে অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা নিয়মবহির্ভূতভাবে দেওয়া ভুয়ো শংসাপত্রগুলি চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং প্রকৃত অনগ্রসর শ্রেণির মানুষ তাঁদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবেন। তবে বিপুল সংখ্যক শংসাপত্র খতিয়ে দেখার এই বিশাল প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। দ্বিতীয়ত, মুসলিম সম্প্রদায়ের ওবিসি সংরক্ষণ বাতিল এবং ঢালাও স্ক্রিনিংয়ের ফলে রাজ্যের একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বা বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে, যা আগামী দিনে সামাজিক ভারসাম্যে নতুন মাত্রার বিতর্ক যোগ করার আশঙ্কা তৈরি করছে।