পুরসভা কি চাইলেই বুলডোজার চালাতে পারে? জানুন বেআইনি নির্মাণ ভাঙার আসল আইনি নিয়ম

পুরসভা কি চাইলেই বুলডোজার চালাতে পারে? জানুন বেআইনি নির্মাণ ভাঙার আসল আইনি নিয়ম

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: তিলজলা, কসবা, বেলেঘাটা থেকে শুরু করে রাজ্যের একাধিক জেলা— গত কয়েকদিন ধরে প্রতিনিয়ত সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নিচ্ছে ‘বুলডোজার অ্যাকশন’। বেআইনি বহুতল থেকে শুরু করে সরকারি জমি দখল করে গড়ে ওঠা নির্মাণ, একের পর এক গুঁড়িয়ে দিচ্ছে প্রশাসন। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে, পুর কর্তৃপক্ষ কি চাইলেই রাতারাতি যেকোনো বাড়ি ভেঙে দিতে পারে? আইন ঠিক কী বলছে? যারা ইতিমধ্যেই ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছেন, তাঁদের করণীয় কী?

হঠাৎ করে বাড়ি ভাঙা কি সম্ভব? আইন যা বলছে

আইনজীবীদের মতে, ভারতীয় সংবিধান ও পুর আইন অনুযায়ী কোনো পুরসভা বা স্থানীয় প্রশাসন হুট করে গিয়ে কোনো নির্মাণ ভেঙে দিতে পারে না। এর জন্য একটি নির্দিষ্ট ও সুদীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।

  • চিহ্নিতকরণ ও পরিদর্শন: প্রথমে কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে বা পুরসভার নিজস্ব পরিদর্শনের মাধ্যমে নিয়ম-বহির্ভূত বা বেআইনি নির্মাণটি চিহ্নিত করা হয়।
  • শোকজ নোটিস (Show Cause Notice): নির্মাণটি বেআইনি মনে হলে, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির মালিক বা প্রোমোটারকে পুরসভার তরফে একটি আইনি নোটিস পাঠানো হয়। সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ থাকে যে, ভবনের কোন অংশটি এবং কেন নিয়মবহির্ভূত।
  • শুনানি বা হিয়ারিং: নোটিসের জবাব দেওয়ার জন্য মালিককে নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে পুর কর্তৃপক্ষের সামনে সশরীরে হাজির হয়ে নিজের সপক্ষে যুক্তি বা নথিপত্র দেখানোর সুযোগ (হিয়ারিং) দেওয়া হয়।
  • ডেমোলিশন অর্ডার (Demolition Order): শুনানিতে মালিকের জবাব সন্তোষজনক না হলে এবং নির্মাণটি সত্যিই বেআইনি প্রমাণিত হলে তবেই পুরসভা চূড়ান্তভাবে ‘ডেমোলিশন অর্ডার’ বা ভাঙার নির্দেশ জারি করে।

আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার অধিকার

পুরসভা ভাঙার নির্দেশ দিলেই সব শেষ হয়ে যায় না। আইনজীবীরা জানাচ্ছেন, কোনো বাড়ির মালিক যদি মনে করেন যে পুরসভার সিদ্ধান্ত ভুল বা অন্যায্য, তবে তিনি উচ্চ আদালত বা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন। আদালত যদি বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে কোনো ‘স্টে অর্ডার’ বা স্থগিতাদেশ জারি করে, তবে প্রশাসন আর সেই নির্মাণে হাত দিতে পারে না।

কোন কোন ক্ষেত্রে দ্রুত বুলডোজার চলতে পারে?

আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘ পথ থাকলেও, কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ করার বিশেষ ক্ষমতা বা ব্যতিক্রমী নিয়ম রয়েছে:

  • বিপজ্জনক ভবন: কোনো নির্মাণ যদি অত্যন্ত জরাজীর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়, যা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটাতে পারে, তবে পুরসভা জনস্বার্থে তা দ্রুত ভেঙে ফেলতে পারে।
  • সরকারি জমি জবরদখল: রেল, সেল (SAIL) বা রাজ্য সরকারের নিজস্ব জমি বেআইনিভাবে দখল করে কোনো নির্মাণ বা রাজনৈতিক কার্যালয় গড়ে উঠলে, জবরদখল মুক্ত করার আইনে সরাসরি বুলডোজার চালানো যায়।

প্ল্যান স্যাংশনের কারচুপি ও ফ্ল্যাট ক্রেতাদের আশঙ্কা

পুরসভা সূত্রের খবর, অনেক সময় প্রোমোটাররা মুনাফার লোভে জি+৩ (চার তলা) ভবনের অনুমতি নিয়ে ছ’তলা বা সাততলা তুলে দেন। আবার অনেক সময় দুটি বাড়ির মধ্যকার নির্দিষ্ট দূরত্ব বা ‘সেটব্যাক রুল’ মানা হয় না। এই ধরনের নির্মাণগুলি কেবল বেআইনিই নয়, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিক থেকেও অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ভূমিকম্পে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপযোগী হয়।

পুর আধিকারিকদের বক্তব্য, নোটিস দেওয়ার পরও যদি প্রোমোটার বা মালিক নিজে থেকে বেআইনি অংশ না ভাঙেন, তবেই পুলিশ বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে আইনশৃঙ্খলার সুরক্ষায় ডেমোলিশন টিম বা বুলডোজার পাঠায় পুরসভা। ফলে ফ্ল্যাট কেনার আগে সেই ভবনের পুর-অনুমোদিত নকশা বা স্যাংশন প্ল্যান ভালো করে যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *