“শুধু মুখের কথায় শ্বশুরবাড়ির সবাইকে কোর্টে টানা যাবে না!” বড় রায় সুপ্রিম কোর্টের

“শুধু মুখের কথায় শ্বশুরবাড়ির সবাইকে কোর্টে টানা যাবে না!” বড় রায় সুপ্রিম কোর্টের

সসুরাল ওয়ালে বা শ্বশুরবাড়ির লোকেরা যদি বউকে মানিয়ে নেওয়ার কথা বলেন, তবে কি তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা চালানো যাবে? সুপ্রিম কোর্টের এক যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ রায়

বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি এবং যৌতুক নিয়ে বধূ নির্যাতনের (IPC 498A) একটি মামলার শুনানিতে সোমবার এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, শুধুমাত্র মৌখিক দাবি বা সাধারণ ছোটখাটো পারিবারিক অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে স্বামীর আত্মীয়দের অর্থাৎ শ্বশুরবাড়ির লোকেদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চালানো যাবে না। এই ধরনের মামলা চালানোর জন্য আদালতের সামনে নিরেট ও জোরালো তথ্যপ্রমাণ থাকা আবশ্যিক। বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি নংমেইকাপম কোটিশ্বর সিংয়ের ডিভিশন বেঞ্চ মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের আদেশ খারিজ করে শ্বশুরবাড়ির লোকেদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বধূ নির্যাতনের মামলাটি সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও হাইকোর্টের অবস্থান

মামলাটির সূত্রপাত মধ্যপ্রদেশের গুনা জেলায়। অভিযোগকারী মহিলার বিয়ে হয়েছিল ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি তাঁর স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের বিরুদ্ধে গুনা থানায় আইপিসির ধারা ৪৯৮এ, ৩৪ এবং যৌতুক আইনের অধীনে একটি এফআইআর দায়ের করেন। মহিলার অভিযোগ ছিল, বিয়ের সময় প্রচুর নগদ ও গয়না দেওয়া সত্ত্বেও শ্বশুরবাড়িতে তাঁকে মানসিক নির্যাতন, সিসিটিভি দিয়ে নজরদারি এবং বন্দি করে রাখা হতো। মামলাটি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের গোয়ালিয়র বেঞ্চে উঠলে, হাইকোর্ট শ্বশুরবাড়ির লোকেদের বিরুদ্ধে মামলা বাতিলের আর্জি খারিজ করে দেয় এবং জানায় যে প্রথম দৃষ্টিকোণে অভিযোগ সত্য বলে মনে হচ্ছে। এরপরই শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও মামলার ভবিষ্যৎ প্রভাব

সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের সেই নির্দেশকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে জানায়, এই মামলার ক্ষেত্রে আইনের চরম অপব্যবহার করা হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া রায়ের প্রধান দিকগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

  • শ্বশুরবাড়ির লোকেদের ঢালাওভাবে জড়ানোর প্রবণতা: শীর্ষ আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে যে, যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে, তখন ক্ষোভ ও তিক্ততার বশে অনেক সময়ই শ্বশুরবাড়ির দূর সম্পর্কের আত্মীয়দেরও মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়। নিম্ন আদালতগুলির উচিত এই ধরনের মামলা গ্রহণের আগে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা।
  • ‘মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ’ কোনো অপরাধ নয়: আদালত স্পষ্ট করে, যদি শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বিবাদের সময় স্বামীকে সমর্থন করেন, মাথা না ঘামান কিংবা পুত্রবধূকে মানিয়ে ও গুছিয়ে চলার (সামঞ্জস্য বা অ্যাডজাস্ট করার) পরামর্শ দেন, তবে তাকে অপরাধমূলক নিষ্ঠুরতা বলা যায় না।
  • আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না: বিচারপতিরা জানান, সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র আত্মীয় হওয়ার অপরাধে গোটা পরিবারকে আদালতে টেনে এনে হেনস্থা করা যাবে না। আইনি প্রক্রিয়াকে প্রতিশোধ নেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য, ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৪৯৮এ ধারাটি বিবাহিত মহিলাদের সুরক্ষা ও যৌতুক প্রতাড়না রুখতে তৈরি একটি অত্যন্ত কঠোর আইন, যা বর্তমানে নতুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) আইনের ৮৫ এবং ৮৬ নম্বর ধারার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে ভবিষ্যতে উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া শ্বশুরবাড়ির লোকেদের বিরুদ্ধে ওঠা ভুয়ো বা অতিরঞ্জিত মামলার প্রবণতা অনেকটাই কমবে বলে মনে করছে আইনি মহল।

एक झलक में

  • সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে যে, সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়া শুধু মৌখিক দাবির ভিত্তিতে শ্বশুরবাড়ির লোকেদের বিরুদ্ধে ৪৯৮এ ধারায় মামলা চালানো যাবে না।
  • পারিবারিক অশান্তির সময় পুত্রবধূকে ‘মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ’ দেওয়া বা স্বামীর পাশে দাঁড়ানো কোনো ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়ে না।
  • মধ্যপ্রদেশের এক দম্পতির মামলায় হাইকোর্টের নির্দেশ খারিজ করে অভিযুক্ত শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করল শীর্ষ আদালত।
  • সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ, বৈবাহিক বিবাদের জেরে শ্বশুরবাড়ির গোটা পরিবারকে হেনস্থা করতে আইনের অপব্যবহার কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *