১১৩ বছরের আভিজাত্যে ধাক্কা, দিল্লির ঐতিহাসিক জিমখানা ক্লাব খালি করার নির্দেশ কেন্দ্রের

ভারতের ক্ষমতার অলিন্দ তথা দিল্লির লুটিয়েন্স জোনে অবস্থিত শতবর্ষ প্রাচীন ও অতি-অভিজাত দিল্লি জিমখানা ক্লাব এবার বন্ধ হতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন লোক কল্যাণ মার্গের কাছে অবস্থিত প্রায় ২৭.৩ একর (৮৭৩ কাঠা) বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই ক্লাবটিকে আগামী ৫ জুনের মধ্যে জমি খালি করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। ২২ মে আবাসন ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের অধীনস্থ ভূমি ও উন্নয়ন দফতর (এল অ্যান্ড ডিও) এই উচ্ছেদ নির্দেশিকা জারি করে। ১৯১৮ সালের ইজারা চুক্তির বিশেষ ধারা প্রয়োগ করে ভারতের রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে এই জমির আইনি মালিকানা সরকার নিজের হাতে ফিরিয়ে নিচ্ছে।
কারণ ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু
কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের রাজধানীর অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কৌশলগত এলাকায় ক্লাবটি অবস্থিত। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনগণের নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত পরিকাঠামো মজবুত ও সুরক্ষিত করার স্বার্থেই এই গুরুত্বপূর্ণ জমির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে এর নেপথ্যে অন্য কারণও রয়েছে। ২০২২ সালে কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রকের এক পরিদর্শনে ক্লাবের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ নিয়োগ এবং জাতীয় নিরাপত্তা লঙ্ঘনের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছিল। রাজনৈতিক মহলে অবশ্য এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে; বিরোধী দল কংগ্রেসের দাবি, রাহুল গান্ধী এই ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণেই সরকারের এই আকস্মিক পদক্ষেপ।
ঐতিহ্য, বৈষম্য ও উচ্ছেদের সম্ভাব্য প্রভাব
১৯১৩ সালে ‘ইম্পেরিয়াল দিল্লি জিমখানা ক্লাব’ নামে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ব্রিটিশ রাজের আভিজাত্যের সঙ্গে জড়িত। তৎকালীন প্রখ্যাত স্থপতি রবার্ট টি রাসেলের নকশায় তৈরি এই ক্লাবে একসময় কেবল ব্রিটিশদের এবং সীমিত কিছু ভারতীয় রাজন্যবর্গের প্রবেশাধিকার ছিল, তাও ভারতীয়দের মূল ভবনে ঢোকা নিষেধ ছিল। স্বাধীনতার পর নাম বদলে এটি দেশের আমলা, সেনা কর্মকর্তা ও বিত্তশালীদের বিনোদন ও সামাজিক মেলামেশার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ক্লাবটির আভিজাত্য এমন পর্যায়ে যে এর সদস্যপদের জন্য অপেক্ষার তালিকা প্রায় ৩৭ বছরের।
সরকারি এই উচ্ছেদ নির্দেশের ফলে বড়সড় সংকটের মুখে পড়েছে ক্লাবের বিপুল সম্পত্তি ও এর সঙ্গে জড়িত সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের তথ্য অনুযায়ী, জিমখানা ক্লাবের নামে প্রায় ১৬২ কোটি টাকার বিনিয়োগ, ২১৭ কোটি টাকার মিউচুয়াল ফান্ড পোর্টফোলিও এবং ১২৯ কোটি টাকার মোট সম্পত্তি রয়েছে। উচ্ছেদের ফলে এই বিশাল পরিকাঠামো যেমন বন্ধ হবে, তেমনই চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ক্লাবের প্রায় ৬০০ স্থায়ী কর্মী। তাঁদের অনেকেই দুই থেকে চার দশক ধরে এখানে কর্মরত। আকস্মিক এই আদেশে কর্মসংস্থান হারিয়ে দিশাহারা কর্মচারীরা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ ও পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
এই উচ্ছেদ ঠেকাতে ইতিমধ্যেই মরিয়া চেষ্টা শুরু করেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। সরকারের এই নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তারা দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। পাশাপাশি, সদস্য ও কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা করতে এবং এই লুইটিয়েন্স দিল্লিতেই কীভাবে ক্লাবের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যায়, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের সঙ্গে দ্রুত জরুরি বৈঠকে বসার আবেদন জানিয়েছে জিমখানা ক্লাব পরিচালন সমিতি।