৮৭ দিনের দীর্ঘ ব্ল্যাকআউট কাটল, যুদ্ধের রেশ পেরিয়ে অবশেষে ইন্টারনেটের দুনিয়ায় ফিরল ইরান

আমেরিকার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের জেরে দীর্ঘ দিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর অবশেষে স্বাভাবিক হচ্ছে ইরানের ডিজিটাল লাইফলাইন। দীর্ঘ ৮৭ দিন পর দেশটিতে পুনরায় ইন্টারনেট পরিষেবা চালু করার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমে মোহাজেরানি মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। তিনি জানান, দেশের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই পরিষেবা দ্রুত সচল করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রককে নির্দেশ দিয়েছেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় তিন মাস পর বিশ্বমঞ্চের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন প্রায় ৯ কোটি ইরানবাসী।
ভাঙল সুদানের বিশ্ব রেকর্ড
ইরানের এই দীর্ঘতম ইন্টারনেট শাটডাউন বিশ্ব ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক রেকর্ড তৈরি করেছে। এর আগে গৃহযুদ্ধের কারণে সুদানে টানা ৩৬ দিন ইন্টারনেট বন্ধ রাখার ঘটনাটি ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম শাটডাউনের রেকর্ড। এবার টানা ৮৭ দিন সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট বজায় রেখে সেই রেকর্ড ভেঙে দিল ইরান। নেটব্লকসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরকার বিরোধী বিক্ষোভের কারণে দফায় দফায় ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে প্রশাসন দেশজুড়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট ঘোষণা করে।
বাণিজ্যিক ও সামাজিক বিপর্যয়
দীর্ঘ তিন মাস ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ স্তব্ধ থাকায় ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জনজীবন মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে। আধুনিক যুগে ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যবসা, চিকিৎসা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মতো জরুরি পরিষেবাগুলো পুরোপুরি ইন্টারনেট নির্ভর। এই দীর্ঘ শাটডাউনের কারণে দেশের বাণিজ্যিক লেনদেন প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল এবং বহির্বিশ্বের সাথে ইরানের সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্ল্যাকআউটের ফলে ইরানের অর্থনীতিতে যে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগবে। একই সাথে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক স্তরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে ইরান সরকারকে।
শান্তি প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
হঠাৎ করে ইন্টারনেট খুলে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনীতি এবং কূটনৈতিক তৎপরতা বড় ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করা হচ্ছে। পাকিস্তান ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক পক্ষের মধ্যস্থতায় আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে পর্দার আড়ালে শান্তি আলোচনা চলছে। সম্প্রতি ইরান ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে সম্মতি জানানোয় যুদ্ধবিরতির একটি আবহ তৈরি হয়েছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তড়িঘড়ি কোনো চুক্তি করতে নারাজ এবং পরিস্থিতি বুঝে ধীরে এগোতে চান, তবুও ইরানের এই পদক্ষেপকে একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ইন্টারনেট পুনর্বহাল দেশের ভেতরকার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রশমন করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলে ইরানের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে।