শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও হিংসা, ১০০-র বেশি মামলা রুজু হতেই ২ কোটি ইউরোর মেগা প্ল্যান মেয়রের!

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে এক ভয়ঙ্কর এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। প্যারিসের বিভিন্ন স্কুলে খুদে পড়ুয়াদের ওপর যৌন শোষণ, শারীরিক হিংসা এবং মানসিক নির্যাতনের ১০০-র বেশি ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। নার্সারি ও প্রাইমারি স্কুলের মতো একেবারে ছোট শিশুদের সুরক্ষার এই করুণ দশা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
এই চরম অরাজকতার বিরুদ্ধে মুখ খুলে প্যারিসের আইনজীবী লরে বেকিউ জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই ৮৪টি প্রি-স্কুল, প্রায় ২০টি প্রাইমারি স্কুল এবং ১০টি ডে-কেয়ার সেন্টারে এই সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে।
তিন-চার বছরের শিশুদের ওপর নারকীয় অত্যাচার
তদন্তে নেমে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ৭৮ জন স্কুল মনিটরকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৩১ জনের বিরুদ্ধে সরাসরি শিশুদের যৌন শোষণের মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাত্র তিন থেকে চার বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশুদের ওপর ধর্ষণের মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে।
- একটি নির্মম ঘটনা: সম্প্রতি এক ৩ বছর বয়সী শিশুর ওপর স্কুল মনিটর কর্তৃক পাশবিক অত্যাচারের ঘটনা সামনে আসে। শিশুটির মা জানান, একদিন সকালে স্কুলের গেটে গিয়ে শিশুটি ভেতরে ঢুকতে অস্বীকার করে এবং ভয়ে কার্যত কুঁকড়ে যায়। পরবর্তীতে প্রকাশ পায় যে ওই মনিটর শিশুটির ওপর চরম নির্যাতন চালিয়েছিল। একই মনিটরের বিরুদ্ধে আরেকটি ৩ বছরের শিশুকন্যাকে ধর্ষণেরও অভিযোগ উঠেছে।
- শারীরিক ও মানসিক হেনস্থা: শুধু যৌন নির্যাতনই নয়, শিশুদের ওপর চিৎকার করা, ধাক্কা দেওয়া, চুল টেনে ধরা, খাবার না দেওয়া এবং জোর করে খাইয়ে বমি করানোর মতো অমানবিক অত্যাচারের কথা পুলিশি অভিযোগে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী অভিভাবকেরা।
কারা এই ‘স্কুল মনিটর’? কেন এই ব্যবস্থার এত বড় গলদ?
ফ্রান্সে ৩ বছর বয়স থেকেই শিশুদের জন্য নার্সারি স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক। ফলে এই স্কুল মনিটররা শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের একটি বড় অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
- ভূমিকা: এরা মূলত স্কুলের টিফিনের বিরতিতে (Break) কিংবা স্কুল ছুটির পর বাবা-মা না আসা পর্যন্ত ছোট ছোট শিশুদের দেখভাল বা দেখাশোনা করেন।
- নিয়োগের গলদ: এই মনিটররা কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ বা সে দেশের শিক্ষা মন্ত্রক দ্বারা সরাসরি নিযুক্ত হন না। এদের স্থানীয় পৌর কাউন্সিল (Local Council) ঘণ্টার চুক্তিতে নিয়োগ করে।
- প্রশিক্ষণের অভাব: বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই মনিটরদের কোনো প্রথাগত বা পেশাদার প্রশিক্ষণ (Formal Training) থাকে না। অভিভাবকদের অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চরম গাফিলতি এবং কঠোর ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন না থাকার কারণেই অপরাধ প্রবণ ব্যক্তিরা শিশুদের দেখভালের দায়িত্ব পেয়ে যাচ্ছে।
মেয়রের ব্যক্তিগত লড়াই এবং ২ কোটি ইউরোর অ্যাকশন প্ল্যান
প্যারিসের নবনিযুক্ত মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোয়ার এই পুরো ব্যবস্থায় এক ‘বিরাট খামতি ও পদ্ধতিগত ত্রুটি’ রয়েছে বলে স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি এই ধরণের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ না মেনে, একে একটি গভীর সামাজিক ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পরিস্থিতি শোধরাতে তিনি ২ কোটি ইউরো (Euro)-র একটি বিশেষ অ্যাকশন প্ল্যান ঘোষণা করেছেন, যা মনিটরদের কড়া স্ক্রিনিং, ট্রেনিং এবং স্কুলগুলোর নিরাপত্তা বাড়াতে খরচ করা হবে।
এক মর্মান্তিক স্বীকারোক্তি: নিজের পরিকল্পনা ঘোষণার সময় মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোয়ার অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান যে, শৈশবে তিনিও এক স্কুল মনিটর দ্বারা যৌন শোষণের শিকার হয়েছিলেন। আর সেই কারণেই শিশুদের সুরক্ষার এই লড়াইকে তিনি ব্যক্তিগত স্তরে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
এক ঝলকে
- প্যারিসের নার্সারি ও প্রাইমারি স্কুলে শিশুদের ওপর যৌন ও মানসিক নির্যাতনের ১০০-র বেশি মামলা রুজু।
- জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে ৭৮ জন স্কুল মনিটর সাসপেন্ড, ৩১ জনের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ।
- স্থানীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিতে নিযুক্ত এই মনিটরদের কোনো পেশাদার প্রশিক্ষণ থাকে না।
- শিক্ষা ব্যবস্থার এই বড় ত্রুটি ঢাকতে ২ কোটি ইউরোর নিরাপত্তা প্যাকেজ ঘোষণা করলেন প্যারিসের মেয়র।