চারতলার অনুমতিতে দেদার উঠছে সাততলা, বেআইনি নির্মাণের নেপথ্যে আসল খেলা ফাঁস করলেন দুঁদে প্রোমোটার

রাজ্যজুড়ে বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে তৎপরতা শুরু হতেই আবাসন শিল্পের অন্দরের এক অন্ধকার দিক প্রকাশ্যে এসেছে। কোথাও চারতলার অনুমতি নিয়ে তৈরি হয়েছে ছ’তলা, কোথাও আবার সাততলা ফ্ল্যাটবাড়ি। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজ্য জুড়ে বেআইনি নির্মাণ ভাঙার অভিযান বা ‘বুলডোজ়ার অ্যাকশন’ শুরু হতেই প্রশ্ন উঠছে, এতদিন ধরে কীভাবে প্রশাসন ও পুরসভার নজর এড়িয়ে রমরমিয়ে চলছিল এই অবৈধ রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য। কলকাতার উপকণ্ঠের এক অভিজ্ঞ প্রোমোটারের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে এর পেছনের আসল কারণ ও যোগসাজশের খতিয়ান।
অতিরিক্ত মুনাফার লোভ ও রাজনৈতিক কাটমানি
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই প্রোমোটারের দাবি অনুযায়ী, বর্তমান বাজারে কলকাতার লাগোয়া ভালো এলাকায় জমি কেনা থেকে শুরু করে বহুতল নির্মাণ পর্যন্ত বিপুল খরচ হয়। দুই কাঠা জমি কিনতেই প্রায় এক কোটি টাকা লাগে, আর বহুতল গড়তে খরচ হয় আরও ৭০ থেকে ৮০ লক্ষ টাকা। এর ওপর জমির মালিকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প তৈরি হওয়ায় লাভের একটি বড় অংশ তাঁর হাতে চলে যায়। সবকিছু বাদ দিয়ে একজন প্রোমোটারের হাতে সাধারণত ৩০ লক্ষ টাকার মতো মুনাফা থাকে।
আসল সমস্যা শুরু হয় এর পর। নির্মাণ কাজ নির্বিঘ্নে চালাতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের মোটা অঙ্কের টাকা বা কাটমানি দিতে হয়। এই অতিরিক্ত খরচের কারণে প্রোমোটারদের লাভের অঙ্ক অনেকটাই কমে যায়। আর সেই ঘাটতি মেটাতে এবং অতিরিক্ত মুনাফার আশায় বহু প্রোমোটার বেআইনি পথ বেছে নেন। অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে পুরসভার নিয়ম ভেঙে অতিরিক্ত এক বা দুটি তলা তুলে দেওয়া হয়। কোথাও আবার নিয়ম অনুযায়ী খোলা জায়গা না রেখেই কার্পেট এরিয়া বাড়িয়ে বেশি স্কোয়ার ফিট বিক্রি করে টাকা আয়ের চেষ্টা চলে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও প্রশাসনের ভূমিকা
টাকা সঠিক জায়গায় পৌঁছে গেলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মদত মেলায় এতদিন কোনো বাধা ছাড়াই এই অবৈধ নির্মাণগুলো চলত বলে দাবি করা হয়েছে। তবে বর্তমানের এই কঠোর অভিযানের ফলে প্রোমোটার মহলে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বেলেঘাটা, তিলজলা ও কসবাসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ নির্মাণ ভাঙার কাজ শুরু হওয়ায় যেমন একদিকে সাধারণ ক্রেতারা বিপাকে পড়ছেন, অন্যদিকে নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত একাংশের মতে, কেবল বুলডোজ়ার চালিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এই চক্র পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে বেআইনি নির্মাণের নেপথ্যে থাকা আর্থিক অনিয়ম এবং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক যোগসাজশের শিকড় উপড়ে ফেলা অত্যন্ত জরুরি।