এভারেস্ট জয়ের পর চিরতরে হারিয়ে গেলেন হায়দরাবাদের অরুণ, দেহ ফিরবে না দেশে

বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করার অনাবিল আনন্দ মুহূর্তেই রূপ নিল চরম বিষাদে। এভারেস্টের চূড়া ছুঁয়ে ফেরার পথে চিরতরে হারিয়ে গেলেন হায়দরাবাদের অভিজ্ঞ পর্বতারোহী অরুণ কুমার তিওয়ারি। ৫৩ বছর বয়সী এই পর্বতপ্রেমীর অকাল প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশের পর্বতারোহণ মহলে। তবে চরম শোকের মুহূর্তেও এক ব্যতিক্রমী ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাঁর পরিবার। অরুণের প্রিয় পাহাড়েই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কোনো শেষকৃত্য বা দেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া করা হবে না।
পেশায় সিনিয়র আইটি প্রফেশনাল অরুণ কুমার তিওয়ারির পর্বত আরোহণ ছিল জীবনের অন্যতম বড় নেশা। এর আগে তিনি রাশিয়ার মাউন্ট এলব্রুস, আমেরিকার মাউন্ট দেনালি ও আর্জেন্টিনার মাউন্ট আকনকাগুয়ার মতো দুর্গম শৃঙ্গগুলো সফলভাবে জয় করেছিলেন। গত বছর এভারেস্ট অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর, এবার আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে তিনি মাঠে নেমেছিলেন। গত ২১ মে বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ দুই শেরপা গাইডসহ এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখেন তিনি। কিন্তু ফেরার পথে প্রায় ৮ হাজার ৭৯০ মিটার উচ্চতায় ‘হিলারি স্টেপ’ এলাকায় তিনি আচমকা তীব্র ক্লান্তি ও অসুস্থতা অনুভব করেন। শেরপারা আপ্রাণ চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। একই অভিযানে সন্দীপ আর নামের আরও এক ভারতীয় আইটি পেশাদার পর্বতারোহীর মৃত্যু হয়েছে, যিনি ২০ মে এভারেস্ট জয় করে ফেরার পথে ক্যাম্প-৪-এ মারা যান।
ডেথ জোনের প্রতিকূলতা ও মৃত্যুর কারণ
হিমালয়ের এই উচ্চতা ‘ডেথ জোন’ নামে পরিচিত, যেখানে অক্সিজেনের মাত্রা ভয়ানক কম থাকে। চিকিৎসকদের মতে, এভারেস্টের চূড়া জয়ের পর নামার সময় আরোহীদের শরীর চরম ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে, যা অনেক সময় তীব্র হাইপোক্সিয়া বা হার্ট অ্যাটাকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অরুণ ও সন্দীপ—দুজনের ক্ষেত্রেই চরম ক্লান্তি ও অক্সিজেনের অভাবই মৃত্যুর মূল কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই জোনে উদ্ধারকারীদের পক্ষেও দীর্ঘক্ষণ টিকে থাকা প্রায় আসাম্ভব।
কেন পাহাড়েই থেকে যাচ্ছেন অরুণ
অরুণ তিওয়ারির পরিবার জানিয়েছে, পাহাড়ই ছিল তাঁর সবচেয়ে ভালোবাসার জায়গা, তাই সেখানেই তাঁকে রেখে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, এই সিদ্ধান্তের পেছনে কিছু বাস্তব ও ঝুঁকিপূর্ণ কারণও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতা থেকে কোনো মরদেহ নিচে নামিয়ে আনা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর জন্য প্রায় ৮ থেকে ১২ জন দক্ষ শেরপা এবং বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন সিলিন্ডারের প্রয়োজন হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এছাড়া দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে মরদেহ বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই সমস্ত দিক বিবেচনা করেই পরিবার অরুণের মরদেহ এভারেস্টেরই অংশ করে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, এভারেস্ট জয় যতটা গৌরবের, নামার পথ ঠিক ততটাই অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ।