তৃণমূল উধাও, সক্রিয় বিএসএফ-পুলিশ! রাজ্যে পালাবদল হতেই সম্পূর্ণ বদলে গেল হাকিমপুর সীমান্তের ছবি

তৃণমূল উধাও, সক্রিয় বিএসএফ-পুলিশ! রাজ্যে পালাবদল হতেই সম্পূর্ণ বদলে গেল হাকিমপুর সীমান্তের ছবি

নিজস্ব প্রতিনিধি: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর আমূল বদলে গিয়েছে উত্তর চব্বিশ পরগনার স্বরূপনগরের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের হাকিমপুরের চেনা ছবি। গত নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এসআইআর (SIR) আবহে যখন অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশ ফেরা নিয়ে সীমান্ত এলাকায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তখন যেখানে রাজ্য পুলিশের কোনো দেখা মেলেনি, আজ সেখানে বিএসএফ এবং পুলিশ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পার্থ ঘোষ এবং এসডিপিও আয়ুষ পাণ্ডের উপস্থিতিতে সীমান্তে এখন কড়া পুলিশি পাহারা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন মাত্র ছ’মাসের ব্যবধানে হাকিমপুর সীমান্তের পুরো সমীকরণটাই বদলে দিয়েছে।

সরাসরি সীমান্ত পার নয়, এবার ঠাঁই ‘হোল্ডিং সেন্টারে’

আগে অনুপ্রবেশকারীদের নাম নথিভুক্ত করে সরাসরি বিএসএফ ক্যাম্প হয়ে বিজিবি-র হাতে তুলে দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমান রাজ্য সরকারের নতুন নিয়মে, অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত হলেই তাঁকে পাঠানো হচ্ছে সরকারি ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ (আটক শিবির)। স্বরূপনগরে ইতিমধ্যেই তিনটি হোল্ডিং সেন্টার চালু হয়েছে— তেঁতুলিয়ার ‘পথের সাথী’ অতিথিশালা, চারঘাট হাইস্কুল সংলগ্ন ফ্লাড শেল্টার এবং মেদিয়ার একটি স্কুল।

পুলিশ ও বিএসএফ যৌথভাবে নথিপত্র পরীক্ষা করার পর বাসে করে তাঁদের এই সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে বিডিও অফিসের তত্ত্বাবধানে ও মিড-ডে মিল কর্মীদের সাহায্যে আটকদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন স্থানীয় মেডিক্যাল অফিসার সৌরভ আচার্য। বাংলাদেশ থেকে সবুজ সংকেত এলে তবেই তাঁদের বিজিবি-র হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর “কাউকে আটকাব না, যারা যেতে চায় যেতে দেওয়া হবে” এই বার্তার ওপর ভরসা রেখেই হোল্ডিং সেন্টারে দিন কাটছে সীমান্তমুখী পরিবারগুলির।

‘বাড়ি বুলডোজ়ার দিয়ে ভেঙে দেবে’, বাড়িওয়ালাদের তাড়া খেয়ে ফিরছেন অনুপ্রবেশকারীরা

ছ’মাস আগের চেয়ে এবারের পরিস্থিতির ফারাক আরও এক জায়গায়। আগে যেখানে অনুপ্রবেশকারীরা এসআইআর-এর ভয়ে স্বইচ্ছায় ফিরছিলেন, এবার তাঁরা ফিরছেন মূলত বাধ্য হয়ে। ঘুনি বস্তি, রাজারহাট, হাওড়া বা দক্ষিণ বারাসাতে এতদিন যাঁরা মাটি আঁকড়ে পড়েছিলেন, বাড়িওয়ালাদের আপত্তিতে এবার তাঁদের পাততাড়ি গোটাতে হচ্ছে। সীমান্তমুখী মফিজুল মোল্লাদের দাবি, “বাড়িওয়ালারা স্পষ্ট বলছেন, তোমরা থাকলে পুলিশ এসে আমাদের ধরে নিয়ে যাবে, বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেবে।” সরকার বদলের পর পুলিশের লাগাতার তল্লাশি ও বুলডোজারের এই আতঙ্কেই তড়িঘড়ি ঘর ছাড়ছেন তাঁরা।

সীমান্তের ত্রিসীমানায় নেই তৃণমূল, সক্রিয় বিজেপি পঞ্চায়েত সদস্যরা

গত নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে হাকিমপুর চেকপোস্টের বাইরে অনুপ্রবেশকারীদের খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যমের ওপর নজরদারি— সবটাই নিয়ন্ত্রণ করত স্থানীয় তৃণমূল নেতারা। এবার হাকিমপুরের সেই চেনা ছবি থেকে সম্পূর্ণ উধাও তৃণমূল। শাসানি ও চোখরাঙানি অতীত। স্থানীয় পঞ্চায়েত বোর্ড খাতায়-কলমে এখনো তৃণমূলের দখলে থাকলেও, তাদের স্বঘোষিত ‘দায়িত্ববোধ’ উবে গিয়েছে।

পরিবর্তে হোল্ডিং সেন্টারগুলির পরিচ্ছন্নতা ও পরিকাঠামো তদারকিতে মধ্যরাত থেকে মাঠে নেমেছেন চারঘাট গ্রাম পঞ্চায়েতের বিজেপি সদস্য রাজেশ মণ্ডল এবং বিজেপি সমর্থিত নির্দল সদস্য মানস বন্দ্যোপাধ্যায়রা। সব মিলিয়ে, নবান্নে ক্ষমতার এক বদলেই বেমালুম বদলে গিয়েছে হাকিমপুর সীমান্তের চেনা কিসসা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *