জামা ছিঁড়ল, ভাঙল চশমা, ছোড়া হলো ডিম-ইট! সোনারপুরে নজিরবিহীন হামলার মুখে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

জামা ছিঁড়ল, ভাঙল চশমা, ছোড়া হলো ডিম-ইট! সোনারপুরে নজিরবিহীন হামলার মুখে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর দীর্ঘ ২৬ দিন পর প্রথমবার কালীঘাটের চার দেওয়াল থেকে রাজপথে বের হতেই নজিরবিহীন ও মারাত্মক বিক্ষোভের মুখে পড়লেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার বিকেলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে ভোট-পরবর্তী হিংসায় নিহত এক তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে তাঁর ওপর এই হামলা হয়। কালো পতাকা দেখানো, ‘চোর-চোর’ স্লোগান থেকে শুরু করে ডায়মন্ড হারবারের বিদায়ী সাংসদকে রাস্তায় ফেলে মারধর, জামা ছিঁড়ে দেওয়া, ইট ও ডিম ছোড়ার ঘটনায় সোনারপুর এলাকায় কার্যত তুলকালাম পরিস্থিতি তৈরি হয়।

কামালগাছি থেকে সোনারপুর— পরতে পরতে সাজানো বিক্ষোভ

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, শনিবার বিকেলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয় কালীঘাট থেকে রওনা হয়ে কামালগাছির সিগন্যালে থামতেই প্রথম অশান্তির সূত্রপাত হয়। সেখানে আচমকাই বেশ কিছু পুরুষ ও মহিলা কালো পতাকা হাতে তাঁর গাড়ির দিকে তেড়ে যান এবং স্লোগান দিতে শুরু করেন। এরপর সোনারপুরে নিহত কর্মীর বাড়ির যত কাছে কনভয় এগোতে থাকে, বিক্ষোভের বহর তত বাড়তে থাকে। অভিযোগ, রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিশাল জমায়েত তৈরি করে আগে থেকেই বিক্ষোভকারীদের ডিম ও ইট প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছিল।

হেলমেট পরে বাইকে চড়ার চেষ্টা, চারপাশ থেকে ডিম-ইটের বৃষ্টি

পরিস্থিতি বেগতিক এবং গাড়ি এগোনো আসাম্ভব দেখে কনভয় থেকে নেমে একটি বাইকে করে এগোনোর চেষ্টা করেন অভিষেক। নিরাপত্তার কারণে তিনি মাথায় একটি হেলমেটও পরে নেন। কিন্তু উত্তেজিত জনতার ভিড়ের কারণে কিছু দূর যেতেই বাইকটিও আটকে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ঠিক এই সময়েই চারপাশ থেকে ‘মার, মার’ স্লোগান তুলে অভিষেককে লক্ষ্য করে একের পর এক ডিম ও ইট ছোড়া শুরু হয়।

বিক্ষোভের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, নিরাপত্তারক্ষীদের বলয় ভেঙে একদল মানুষ অভিষেকের ওপর চড়াও হয়। তাঁকে মারাত্মক ধাক্কাধাক্কি করা হয় এবং ধস্তাধস্তির জেরে তাঁর গায়ে থাকা জামা ছিঁড়ে যায়। এই হামলায় তাঁর চোখের চশমাটিও ভেঙে গিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। নিরাপত্তারক্ষীরা কোনোমতে তাঁকে আগলে উদ্ধার করে নিয়ে যান।

‘আমাকে খুনের চেষ্টা হয়েছে’, পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে সরব অভিষেক

সমস্ত বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত নিহত দলীয় কর্মীর বাড়িতে পৌঁছালেও, সেখানে গিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন মানসিকভাবে বিধ্বস্ত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর এই সফরের জন্য পর্যাপ্ত পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি।

ভাঙা চশমা হাতে নিয়ে অভিষেক দাবি করেন, “আমি আসার আগেই সাক্ষী রাখার জন্য হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো পুলিশের দেখা মেলেনি। আমার চশমা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, আমাকে কার্যত খুনের চেষ্টা হয়েছে। আমি এই ঘটনার জন্য হাইকোর্ট এবং রাজ্যপালের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এটাই কি নতুন সরকারের জমানায় গণতন্ত্রের নমুনা?”

এখানেই শেষ নয়, আক্রান্ত তৃণমূল কর্মীর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। অভিষেক স্পষ্ট জানান, “আমি এখান থেকে বেরিয়ে গেলেই এই পরিবারের ওপর নতুন করে হামলা হতে পারে। তাই যতক্ষণ না প্রশাসন থেকে এখানে পর্যাপ্ত পুলিশ পাঠানো হচ্ছে, ততক্ষণ আমি এই বাড়ি থেকে এক পা-ও বেরোব না।” রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর এমন প্রকাশ্য সশরীরে হামলা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মোড় এনে দিল বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *