বিদায় নিলেন বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া সেই কিংবদন্তি তোফায়েল আহমেদ!

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক, বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত ও জটিল শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে সোমবার দুপুর সাড়ে তিনটেয় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর এই প্রয়াণে দেশের সমগ্র রাজনৈতিক মহলে এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ। সম্প্রতি তিনি তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি চিরবিদায় নেন। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই ক্ষণজন্মা নেতা ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির মূল স্রোতে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
ইতিহাসের নির্মাতা ও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ছিল ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। সে সময় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসমুদ্রে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর চার প্রধানের অন্যতম হিসেবে তিনি সরাসরি যুদ্ধের রণকৌশল ও পরিকল্পনা সামলান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেন।
সংসদীয় রাজনীতি ও অপূরণীয় ক্ষতি
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তোফায়েল আহমেদ মোট ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দল ও সরকারের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে তিনি একাধিকবার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে দেশ গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে শামিল হয়ে জীবনের বহু বছর তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তোফায়েল আহমেদের প্রয়াণ বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করল। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাঠপর্যায়ের ইতিহাস এবং অভিজ্ঞ সংসদীয় রাজনীতির যে প্রজ্ঞা তাঁর মধ্যে ছিল, তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য একটি বড় দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করত। তাঁর চলে যাওয়া দেশের ত্যাগী ও নীতিবান রাজনীতির ইতিহাসে একটি যুগের অবসান ঘটাল।