ক্ষমতা বদলের আবহেও মমতার প্রশংসায় আবুল বাশার, দুর্দিনের ধর্নায় অনুপস্থিতির কারণ শারীরিক অসুস্থতা

ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর এক মাসও পার হয়নি, এর মধ্যেই নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি তৃণমূল কংগ্রেস। দলের অন্দরে ভাঙন এবং একাধিক বিধায়ক ও নেতার ক্ষোভ প্রকাশের আবহে মঙ্গলবার রানি রাসমণি রোডে এক বিশেষ ধর্না কর্মসূচিতে বসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এই দুর্দিনের প্রতিবাদ মঞ্চে যেমন দেখা মেলেনি বহু দলীয় বিধায়কের, তেমনই অনুপস্থিত ছিলেন এককালের কট্টর সমর্থক ও বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশ, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তুমুল জল্পনা শুরু হয়েছে।
ভোট-পরবর্তী হিংসা, রিগিং এবং হকার উচ্ছেদের মতো একাধিক ইস্যুকে সামনে রেখে বিরোধী নেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতা হারাতেই কি তবে বুদ্ধিজীবীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন? অতীতে যিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জীবনানন্দ দাশ বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিরল প্রতিভার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, সেই প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল বাশারের এই ধর্নামঞ্চে অনুপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। তবে এই অনুপস্থিতিকে রাজনৈতিক ভোলবদল বা রং বদলানোর তত্ত্ব হিসেবে মানতে নারাজ ‘ফুল বউ’ খ্যাত এই প্রবীণ লেখক।
রাজনীতি নয়, মমতার প্রতিবাদী সত্তার গুণগ্রাহী
এই বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে সাহিত্যিক আবুল বাশার জানিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, বরং এটি একজন সাহিত্যিকের সঙ্গে একজন প্রতিবাদী চরিত্রের সম্পর্ক। তিনি অতীতেও সক্রিয় রাজনীতি করেননি এবং কোনোদিন কোনো দলের রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। জরুরি অবস্থার পটভূমিতে তাঁর লেখা উপন্যাস ‘অগ্নিবলাকা’ থেকে শুরু করে বামপন্থী বা নকশাল আন্দোলনের প্রতি তাঁর যে বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ ছিল, তা কেবলই আদর্শগত স্তর থেকে। তাঁর চোখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন বাংলার প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী এবং নারীর সার্বিক বিকাশের অন্যতম কাণ্ডারি, যিনি ইতিহাসের এক অনন্য প্রতিবাদী নারী চরিত্র।
হকার উচ্ছেদ ও সম্ভাব্য গণবিক্ষোভের ইঙ্গিত
রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের পক্ষ থেকে যেভাবে কলকাতায় বুলডোজার চালিয়ে হকার উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তাকে তীব্র ভাষায় ‘অমানবিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন আবুল বাশার। কলকাতার নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস না করে হকারদের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন তিনি। এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে তিনি সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষকে বারবার ভয় দেখালে একসময় সেই ভয় ভেঙে যায় এবং মানুষ রুখে দাঁড়ায়। অতীতে নেপাল, শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ ও স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহের নেত্রী হিসেবে আবারও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই সামনে চলে আসতে পারেন বলে তিনি মনে করেন।
ধর্না মঞ্চে সশরীরে উপস্থিত না থাকার কারণ হিসেবে তিনি তাঁর বার্ধক্যজনিত শারীরিক অসুস্থতা ও চলাফেরার অক্ষমতাকে দায়ী করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে কোনোদিন ডেকে পাঠাননি, বরং তিনি নিজের তাগিদেই অতীতে কষ্ট করে ধর্না মঞ্চে শামিল হয়েছিলেন। বর্তমানেও তিনি মমতার কবি ও প্রতিবাদী সত্তার সমান প্রশংসক এবং পরিস্থিতি দাবি করলে ও শরীর সাথ দিলে আগামী দিনেও গরিব মানুষের স্বার্থে এবং হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে পথে নামতে তিনি দ্বিধাবোধ করবেন না।