শিক্ষা প্রাঙ্গণে টাকার পাহাড় আর বিলাসবহুল বেডরুম, কাঠগড়ায় সুরেন্দ্রনাথ কলেজের প্রভাবশালী পিতা-পুত্র

শিক্ষা প্রাঙ্গণে টাকার পাহাড় আর বিলাসবহুল বেডরুম, কাঠগড়ায় সুরেন্দ্রনাথ কলেজের প্রভাবশালী পিতা-পুত্র

কলকাতার ঐতিহ্যবাহী সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ইউনিয়ন রুম থেকে লক্ষাধিক টাকা এবং আপত্তিকর সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। এই ঘটনার মূল অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে ‘কান কাটা’ দেবু এবং তাঁর ছেলে শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। কলেজের ইউনিয়ন রুমের আলমারি থেকে বস্তা বন্দি উইয়ে খাওয়া টাকা উদ্ধারের পর থেকেই শিক্ষাঙ্গনের অন্দরে চলা দীর্ঘদিনের দুর্নীতির খতিয়ান প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। এই ঘটনায় দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়সহ দু’জনের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছে এবং কলেজের ভেন্ডর পরিতোষ দত্তর নামে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ইউনিয়ন রুমে বিলাসের ছোঁয়া ও শিবাশিসের উত্থান

তদন্তে জানা গেছে, সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ভেতরে কার্যত নিজেদের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন দেবাশিস ও তাঁর ছেলে শিবাশিস। কলেজের ভেতরেই তাঁরা বানিয়েছিলেন একটি বিলাসবহুল বেডরুম, যেখানে বিছানা, বালিশ থেকে শুরু করে অ্যাটাচ বাথরুম—সবকিছুরই ব্যবস্থা ছিল। শাসকদলের প্রভাবশালী নেতা তথা সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে এই পিতা-পুত্রের ওপর কারোর হাত দেওয়ার সাহস ছিল না।

অভিযোগ রয়েছে, বাবার তোলাবাজির টাকায় লন্ডন থেকে পড়াশোনা শেষ করে আসেন শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১২ সালে সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজ থেকে আইন পাস এবং পরবর্তীতে নেতাজি সুভাষ ওপেন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর দ্রুত তাঁর রাজনৈতিক ও পেশাগত উত্থান ঘটে। ২০১৩ সালে সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের স্টুডেন্টস ইউনিয়নের জিএস হওয়া থেকে শুরু করে গভর্নিং বডির মেম্বার, রাজ্য যুব উৎসবের কনভেনর এবং সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাবে টিএমসিপির মধ্য কলকাতা সভাপতির পদও পান তিনি। শেষ পর্যন্ত সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজেই স্যাক্ট (SACT) অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন শিবাশিস।

ভর্তি দুর্নীতি ও সম্ভাব্য প্রভাব

কলেজের ইউনিয়ন রুমের আলমারি থেকে উদ্ধার হওয়া দুই ব্যাগ ভর্তি উইয়ে খাওয়া টাকা নিয়ে শাসকদলকে তীব্র নিশানা করেছে বিরোধী শিবির। বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ এই ঘটনাকে চাকরি দুর্নীতির মতোই বড়সড় ‘ভর্তি দুর্নীতি’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, এই কোটি কোটি টাকা সাধারণ ঘরের ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির বিনিময়ে নেওয়া হয়েছে। কলেজের ফাংশন ফান্ডেও দেড় কোটি টাকার বেশি পড়ে রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ তোলেন এবং এই চক্রের মাথাদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই ঘটনা কলকাতার কলেজগুলির প্রশাসনিক নজরদারি এবং ছাত্র রাজনীতির অন্ধকার দিকটিকে পুনরায় সামনে এনেছে। শিক্ষাঙ্গনের ভেতরে এই ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপ ও বিপুল অর্থের লেনদেন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ঘটনার জেরে কলেজের শিক্ষার পরিবেশ যেমন কলঙ্কিত হয়েছে, তেমনই পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর বিষয়টি আগামী দিনে শিক্ষা প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদলের চাপ তৈরি করতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *