হাতছাড়া পরিষদীয় দল, অস্তিত্বের সংকটে তৃণমূলের প্রতীক রক্ষায় কোন পথে হাঁটবেন মমতা

আটাশ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কার মুখোমুখি তৃণমূল কংগ্রেস। যেভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একদা কংগ্রেস ভেঙে নিজের দল গড়েছিলেন, প্রায় একই কায়দায় এবার তাঁর দলই খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেল। স্পিকার রথীন্দ্র বোসের স্বীকৃতির পর ৫৮ জন ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে বিধানসভার বিরোধী দলনেতার চেয়ারে বসেছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ভাঙনের জেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে পরিষদীয় দলের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ চলে গেছে। রাজ্য রাজনীতিতে ‘নতুন তৃণমূল’-এর এই আত্মপ্রকাশ দলনেত্রীর একচ্ছত্র আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বিদ্রোহী শিবিরের স্পষ্ট বার্তা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেবলই একজন ‘পরামর্শদাতা’ হিসেবে থাকতে পারেন, তবে দলের মূল চালিকাশক্তি থাকবে তাঁদের হাতেই। এই পরিস্থিতিতে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এবং দলের প্রতীক রক্ষা করতে কালীঘাটে কুণাল ঘোষ, ফিরহাদ হাকিম, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছেন মমতা।
আইনি লড়াই ও প্রতীক বাঁচানোর সমীকরণ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে প্রথম পথটি হলো আইনি। স্পিকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আদালতে যেতে পারেন, কারণ তাঁর শিবিরের দাবি অনুযায়ী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ই আসল বিরোধী দলনেতা। যদিও পরিষদীয় বিষয়ে আদালত সাধারণত হস্তক্ষেপ করে না, তবে অতীতে স্পিকারের সিদ্ধান্ত বদলের নজির রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, মমতা সমস্ত বিদ্রোহী বিধায়ককে বহিষ্কার করতে পারেন। তেমনটা হলে তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা কমে দাঁড়াবে ২০-তে, যার ফলে দল প্রধান বিরোধীর মর্যাদা হারাবে। এর পর প্রতীক ও নামের অধিকার নিয়ে লড়াই গড়াবে নির্বাচন কমিশনে। কমিশন শুধু বিধায়ক নয়, সাংসদ ও সাংগঠনিক পদাধিকারীদের মতামত খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেবে। ফলে এই ভাঙন সাংসদদের মধ্যে কতটা ছড়িয়েছে, তার ওপরই নির্ভর করছে প্রতীকের ভবিষ্যৎ।
অভিষেক কাঁটা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা করে তাঁদের মূল স্রোতে ফেরানোর তৃতীয় পথটি প্রায় আসাম্ভব। বিদ্রোহী বিধায়করা দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে কোনোভাবেই মেনে নিতে রাজি নন। তাঁদের হাবেভাবে স্পষ্ট যে, অভিষেক যেখানে আছেন, তাঁরা সেখানে নেই। ফলে কোনো আপস করতে হলে অভিষেককে সরাতে হবে, যা মমতার পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। অন্যদিকে ঋতব্রতর সঙ্গে আলোচনায় বসা মমতার রাজনৈতিক মর্যাদার সঙ্গেও সংঘাতপূর্ণ। আপাতদৃষ্টে, উত্তরাধিকারের এই লড়াইয়ে নিজের তৈরি দল রক্ষায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ পর্যন্ত কোনো কড়া আইনি পথে যান নাকি ভাইপোর পক্ষে দাঁড়িয়ে চূড়ান্ত রাজনৈতিক যুদ্ধে নামেন, সেটাই এখন দেখার।