মমতা ভালো অথচ অভিষেক খারাপ, নতুন তৃণমূলের এই তত্ত্ব কি আসলে নেত্রীকে প্যাঁচে ফেলার কৌশল

মমতা ভালো অথচ অভিষেক খারাপ, নতুন তৃণমূলের এই তত্ত্ব কি আসলে নেত্রীকে প্যাঁচে ফেলার কৌশল

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ ও ক্ষমতার অলিন্দে থাকা দ্বন্দ্ব এবার প্রকাশ্য বিদ্রোহের রূপ নিয়েছে। দলের প্রায় ৬০ জন বিধায়ককে এক ছাতার তলায় এনে ‘নতুন তৃণমূল’ নামে আলাদা পরিষদীয় দলের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছেন বিক্ষুব্ধ নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। স্পিকারের ছাড়পত্র পেয়ে ঋতব্রত যখন বিরোধী দলনেতার আসনে বসছেন, তখন দলের অন্দরে সমান্তরাল সমীকরণ তৈরির এক সুক্ষ্ম রাজনৈতিক চাল স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিক্ষুব্ধদের মূল রণকৌশল হলো দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা, কিন্তু তাঁর ভাইপো তথা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে বর্জন করা।

অভিষেক-বিরোধী ক্ষোভ ও নতুন সমীকরণ

তৃণমূলের এই অভূতপূর্ব ভাঙনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে দলের সাংগঠনিক পরিচালনা পদ্ধতি এবং শীর্ষ নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ বিরোধ। বিদ্রোহী বিধায়কদের স্পষ্ট দাবি, কর্পোরেট স্টাইলে দল পরিচালনা এবং তৃণমূল স্তরের নেতাদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার একক দায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর এই ক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে, যার ফলে দলনেত্রীর সঙ্গে অভিষেকের রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বিদ্রোহীরা। ‘নতুন তৃণমূল’ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শ মেনে নিতে তাদের কোনো আপত্তি নেই, তবে অভিষেককে কোনোভাবেই ‘সেনাপতি’ হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এর মাধ্যমে পরিষদীয় দলকে অভিষেকের প্রভাবমুক্ত একটি সম্পূর্ণ আলাদা বৃত্তে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।

মমতার উভয় সংকট ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাব

নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের এই কৌশল আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এক চরম রাজনৈতিক উভয় সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিদ্রোহীরা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছেন যেখানে মমতাকে হয় তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, না হয় তাঁর নিজের হাতে গড়া দল ও ৬০ জন বিধায়কের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। মমতা যদি অপত্য স্নেহে অন্ধ হয়ে অভিষেকের পাশে দাঁড়ান, তবে রাজ্য রাজনীতিতে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। আর যদি তিনি বিদ্রোহীদের শর্ত মেনে নেন, তবে অভিষেক রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়ে পড়বেন এবং ইডি-সিবিআই-এর মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির আইনি লড়াইয়ে একাকী হয়ে যাবেন। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থা এখন মহাভারতের পিতামহ ভীষ্মের মতো, যেখানে চোখের সামনে নিজের তৈরি সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে দেখলেও করার কিছু থাকছে না। এই সম্মিলিত নেতৃত্বের চাল আগামী দিনে রাজ্যের শাসক দলের রাশ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দূরগামী প্রভাব ফেলতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *