ইরান যুদ্ধের ছায়ায় ভারত-ব্রিটেন নতুন সমীকরণ, দায়িত্ব নিয়েই দিল্লি এলেন ইভেট কুপার

বিশ্বজুড়ে চলমান ইরান যুদ্ধের জেরে দ্রুত গতিতে পাল্টাচ্ছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই ব্রিটেনের নতুন লেবার সরকারের বিদেশ সচিব ইভেট কুপারের দু’দিনের ভারত সফর দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরেই তাঁর নয়াদিল্লিকে বেছে নেওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। এই সফরে প্রতিরক্ষা, উন্নত প্রযুক্তি, খনিজ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লন্ডন সফরের সময় ‘ভারত-ব্রিটেন ভিশন ২০৩৫’ প্রকল্প গৃহীত হয়েছিল। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করা। ইভেট কুপারের এই সফরের মাধ্যমে ভিশন ২০৩৫-এর প্রথম বার্ষিক পর্যালোচনা সম্পন্ন হলো। ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকরের সঙ্গে বৈঠকে মূলত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিচ্ছন্ন শক্তি, শিক্ষা এবং সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে। এছাড়া কুপার আলাদাভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
জ্বালানি সংকট ও বিকল্পের খোঁজে ভারত
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে উদ্ভূত সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে যে হাহাকার তৈরি হয়েছে, তা থেকে মুক্তি পেতে ভারত বিকল্প পথের সন্ধান করছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের সাথে সামরিক ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ভারত তার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্যান্য দেশের সাথেও যোগাযোগ রাখছে।
কূটনৈতিক অঙ্ক ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
এই সংকটের মধ্যেই দক্ষিণ আমেরিকার খনিজ তেল সমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজও ভারত সফরে এসেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ফলে একদিকে যেমন ব্রিটেনের সাথে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারতের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভেনেজুয়েলার মতো দেশের সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক অস্থিরতা ভারতকে তার পররাষ্ট্রনীতি পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য করছে। ব্রিটেনের শীর্ষ কূটনীতিকের এই সফর এবং দুই দেশের মধ্যে হওয়া চুক্তিগুলো আগামী দিনে এশিয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট যে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো একক ব্লকের ওপর নির্ভর না করে ভারত বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে নিজের জাতীয় স্বার্থ ও জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় তৎপর হয়েছে।