বিজেপিতে মহাকাব্যিক দলবদলের মহানাটকেও কি দেব শুধুই পার্শ্বচরিত্র

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের নজিরবিহীন ভরাডুবির পর জাতীয় রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সোমবার দিল্লির বুকে তৃণমূল সংসদীয় দলে এক ঐতিহাসিক ধস নেমেছে। রাজনৈতিক মহলের জোর জল্পনা, অন্তত ১৫ থেকে ১৬ জন তৃণমূল সাংসদ একসঙ্গে দল ছেড়ে পদ্ম শিবিরে যোগ দিতে চলেছেন। এই নজিরবিহীন মহাকাব্যিক দলবদল উপাখ্যানে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘ব্রুটাস তুমিও!’-র মতোই সবচেয়ে বড় চমক ও কৌতুহল তৈরি হয়েছে ঘাটালের তারকা সাংসদ দীপক অধিকারী ওরফে দেবকে কেন্দ্র করে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মেগা ড্রামায় দেব মূল চরিত্র বা প্রোটাগনিস্ট নন, বরং তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছেন।
নেপথ্যে টলিউডের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই দেব রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। টলিউডের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, শাসকদলের প্রভাবশালী ‘বিশ্ব ব্রাদার্স’-এর লাগাতার উৎপাতে তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। অরূপ বিশ্বাস তাঁর ছবির জন্য নন্দনে স্ক্রিনিং পেতে বাধা সৃষ্টি করছিলেন এবং তাঁর ভাই স্বরূপ বিশ্বাস টলিউড ফেডারেশনের রাশ টেনে দেবের ছবির শুটিংয়ে একের পর এক জট তৈরি করছিলেন। এর পাশাপাশি নিজের নির্বাচনী এলাকা ঘাটালের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতে না পারার একরাশ ক্ষোভ ও অভিমান ছিল দেবের মনে।
পরবর্তীতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে উদ্যোগী হয়ে দেবের মান ভাঙান। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের জন্য আড়াইশ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পর দেব পুনরায় নির্বাচনে লড়তে রাজি হন। তবে ভেতরে ভেতরে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও প্রতিবাদের কারণে রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যায়, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বর্তমান পরিস্থিতিতে।
শুভেন্দু-মিঠুন কানেকশন ও দিল্লির গোপন বৈঠক
বিজেপির শীর্ষ স্তরের দাবি, দেব ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রক শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেছেন। সোমবার দিল্লির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে যখন ১২ জন তৃণমূল সাংসদ রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছিলেন, তখন দেব সেখানে সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও দিল্লিরই এক অভিজাত হোটেলে অবস্থান করছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, বাকি সাংসদদের ভিড়ে শামিল না হয়ে দেব সম্পূর্ণ পৃথকভাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব ও বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবের সঙ্গে চূড়ান্ত বৈঠক সারবেন।
বাস্তব জীবনে বিজেপির মহাগুরু মিঠুন চক্রবর্তী ও শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেবের দীর্ঘদিনের মধুর ও পেশাদার সম্পর্ক এই দলবদলের পথকে আরও মসৃণ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ঘাটালের এই তারকা সাংসদ এখনও সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ না খুললেও, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নিজের ব্যক্তিগত ‘মাস্টারপ্ল্যান’ সফল করতেই তিনি শেষ পর্যন্ত ঘাসফুল ত্যাগ করে পদ্ম শিবিরের নৌকায় সওয়ার হতে যাচ্ছেন।