স্বামী-স্ত্রীর ‘ড্রাগ সাম্রাজ্য’! মাত্র ৭ দিনে উদ্ধার ২৬ কোটির মাদক, পারিবারিক ব্যবসার কায়দা দেখে চক্ষু চড়কগাছ পুলিশের

স্বামী-স্ত্রীর ‘ড্রাগ সাম্রাজ্য’! মাত্র ৭ দিনে উদ্ধার ২৬ কোটির মাদক, পারিবারিক ব্যবসার কায়দা দেখে চক্ষু চড়কগাছ পুলিশের

পাটনা: বিহারের পাটনায় হদিশ মিলল এক আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের, যা কোনো পেশাদার গ্যাং নয়, বরং পরিচালিত হতো পুরো একটি পরিবারের মাধ্যমে। স্বামী, স্ত্রী, শ্যালক এবং ভাসুর মিলে রীতিমতো ‘পারিবারিক ব্যবসা’র মতো চালাত এই ড্রাগ সিন্ডিকেট। গত এক সপ্তাহে পাটনা পুলিশের বিশেষ দল (DIU) একের পর এক অভিযান চালিয়ে এই চক্রের কাছ থেকে ২৬ কোটি টাকার ব্রাউন সুগার, হেরোইন এবং স্ম্যাক উদ্ধার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রের থেকে এ পর্যন্ত মোট ৫০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের মাদক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

নেপথ্যে স্বামী-স্ত্রী ও দৈনিক বেতনের শ্যালক!

এই আন্তর্জাতিক ড্রাগ র‍্যাকেটের মূল হোতা সন্তোষ সাউ এবং তার স্ত্রী রেখা দেবী। তারা দীর্ঘদিন ধরে পাটনায় এই সিন্থেটিক মাদক সরবরাহ করছিল। সম্প্রতি ফুলওয়ারিশরিফের গোপালপুরে অভিযান চালিয়ে সন্তোষের শ্যালক কৃষ্ণ কুমার রামকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জেরায় কৃষ্ণ স্বীকার করে যে, তার দিদি রেখা এবং জামাইবাবু সন্তোষ মিলে এই পুরো নেটওয়ার্ক চালায়। আর এই চক্রে মাদকের ডেলিভারি এবং স্টক পাহারা দেওয়ার জন্য কৃষ্ণকে প্রতিদিন ৮,০০০ টাকা করে ‘দৈনিক মজুরি’ দেওয়া হতো।

গোপন আস্তানায় হানা, উদ্ধার অস্ত্র ও কোটি কোটি টাকার মাদক

গোপালপুর থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাটনা পুলিশের বিশেষ দল এবং ম্যাজিস্ট্রেট রামকৃষ্ণ নগর থানা এলাকার সোরংপুরের একটি বাড়িতে মধ্যরাতে অতর্কিতে হানা দেয়। সেখান থেকে চিন্টু (ওরফে ছোটু) এবং মনু কুমার নামে চক্রের দুই সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ সেখান থেকে ১৫ কেজি স্ম্যাক, একটি পিস্তল, একটি দেশি বন্দুক, লাইভ কার্তুজ, বুলেট বাইক এবং ১৫ কোটি টাকা মূল্যের হেরোইন ও ব্রাউন সুগার উদ্ধার করেছে। এর পাশাপাশি ১১ লিটার চোলাই মদ এবং ৩টি মোবাইল ফোনও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

স্কুল-কলেজের পড়ুয়ারাই ছিল মূল টার্গেট

তদন্তে জানা গেছে, পুলিশের চোখ এড়াতে এই গ্যাং একটি চুরি করা স্করপিও গাড়ি ব্যবহার করত। উত্তরপ্রদেশের মোগলসরাই এবং গাজিপুর থেকে মাদকের বড় বড় চালান নিয়ে আসা হতো। এরপর বক্সার হয়ে তা পাটনায় ঢুকত। সেখানে বড় চালানটিকে ছোট ছোট ডোজে ভাগ করে পাটনার শহর ও গ্রামীণ এলাকার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং যুবসমাজের কাছে চড়া দামে বিক্রি করা হতো। বর্তমানে মূল হোতা সন্তোষ সাউ, তার স্ত্রী রেখা দেবী এবং তাদের সহযোগী সীমা কুমারীকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালাচ্ছে।

ড্রাগের কালো টাকা সাদা করতে কেনা হতো কোটি কোটি টাকার জমি

মাদক ব্যবসা থেকে উপার্জিত বিপুল কালো টাকা সাদা করতে (মানি লন্ডারিং) সন্তোষ সাউ তার স্ত্রী রেখা দেবী এবং বাবা রাজু সাউয়ের নামে পাটনার একাধিক নামী ও দামি এলাকায় কোটি কোটি টাকার জমি এবং সম্পত্তি কিনেছিল। এই বিপুল সম্পত্তির হদিশ মেলায় এখন এই ঘটনার তদন্তে নামতে পারে অর্থনৈতিক অপরাধ শাখা (EOU)।

মহিলা সাব-ইন্সপেক্টরের বুদ্ধিতেই কেল্লাফতে

এই বিশাল ড্রাগ সিন্ডিকেটটি ধ্বংস করার মূল কৃতিত্ব মহিলা সাব-ইন্সপেক্টর জয়া কুমারীর। গত ৩ জুন রাতে তাঁর কাছে একটি গোপন সূত্রে খবর আসে। তিনি কালবিলম্ব না করে ডিআইইউ টিম এবং সার্কেল অফিসারকে সাথে নিয়ে সন্তোষ সাউয়ের বাড়ি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেন। সন্তোষের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে সে সময় ৫.৮১৫ কেজি হেরোইন এবং ৮১৫ গ্রাম ব্রাউন সুগার উদ্ধার করা হয়, যার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা। এ ছাড়াও নগদ ১৮,৬৬,১১০ টাকা, অস্ত্রশস্ত্র এবং সেই স্করপিও গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। এই সূত্র ধরেই শেষ পর্যন্ত পুরো চক্রের পর্দাফাঁস করল পুলিশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *