২৫ বছরের লিভ-ইন সম্পর্কে ইতি, সন্তানেরাই ছাদনাতলায় নিয়ে গেলেন ষাটোর্ধ্ব বাবা-মাকে!

আধুনিক যুগে লিভ-ইন সম্পর্কের গ্রহণযোগ্যতা বাড়লেও তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে সামাজিক অবক্ষয়— হরেক রকমের অভিযোগে প্রায়শই কাঠগড়ায় ওঠে এই জীবনধারা। কিন্তু এই চেনা বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করলেন রাজস্থানের এক আদিবাসী যুগল। ২৫ বছর ধরে এক ছাদের নিচে থাকার পর, রজত জয়ন্তী পেরিয়ে অবশেষে প্রথাগত বিয়ের পিঁড়িতে বসলেন ৬০ বছরের বর রত্না এবং ৫৮ বছরের কনে কড়বি দেবী। দীর্ঘ এই পথচলার পর বাবা-মায়ের চার হাত এক করার মূল কারিগর তাঁদের সন্তানেরাই।
দারিদ্র্যের লড়াই ও ‘নাতরা প্রথা’
রাজস্থানের বাঁসওয়ারা জেলার আদিবাসী অধ্যুষিত সালিয়া গ্রামের বাসিন্দা রত্না ও কড়বি দেবী। ২৫ বছর আগে যখন তাঁরা একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তখন সমাজ আজকের মতো প্রগতিশীল ছিল না। সেই জমানায় লিভ-ইন সম্পর্কের কথা ভাবাই ছিল দুঃসাহসিক। তবে তাঁদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে আধুনিক বিলাসবহুল মানসিকতা নয়, বরং ছিল চরম আর্থিক সংকট। প্রথাগত সামাজিক বিয়ের বিপুল খরচ বহন করার সামর্থ্য তখন তাঁদের ছিল না। বাধ্য হয়েই তাঁরা আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘নাতরা প্রথা’ মেনে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই একসঙ্গে সংসার শুরু করেন।
সামাজিক স্বীকৃতি ও সন্তানের উদ্যোগ
গত আড়াই দশকে রত্না ও কড়বি দেবীর জীবনে জল গড়িয়েছে অনেক। আর্থিক দুর্দশা কাটিয়ে সংসারে এসেছে সচ্ছলতা। নিজেদের চার ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিয়ে সামাজিক দায়িত্বও পালন করেছেন এই যুগল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে বার্ধক্যের ছাপ পড়লেও কমেনি পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসা। এই পরিস্থিতিতে বাবা-মায়ের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক স্বীকৃতি দিতে এগিয়ে আসেন তাঁদের সন্তানেরাই। সন্তানদের উদ্যোগেই আদিবাসী ঐতিহ্য মেনে জাঁকজমকপূর্ণভাবে এই বিয়ের আয়োজন করা হয়।
গায়ে হলুদ থেকে শুরু করে আদিবাসী রীতি অনুযায়ী ধামসা, মাদল ও ঐতিহ্যবাহী নাচের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় বিয়ের মূল অনুষ্ঠান। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে শুধু আত্মীয়স্বজনই নন, বর-কনেকে শুভেচ্ছা জানাতে ভিড় জমিয়েছিলেন গোটা গ্রামের মানুষ।
সম্পর্কের নতুন বার্তা
এই অভিনব ঘটনাটি বর্তমান সমাজে সম্পর্কের স্থায়িত্ব এবং পারিবারিক মূল্যবোধের এক ইতিবাচক প্রভাব নির্দেশ করে। এটি প্রমাণ করে যে, কেবল আইনি বা সামাজিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং পারস্পরিক ভরসা ও ভালোবাসাই একটি সম্পর্কের আসল ভিত্তি। দারিদ্র্যের কারণে যে সামাজিক স্বীকৃতি ২৫ বছর আগে অধরা ছিল, সন্তানদের হাত ধরে বার্ধক্যে এসে তা পূর্ণতা পেল। এই ঘটনাটি আদিবাসী সমাজ তো বটেই, আধুনিক সমাজের কাছেও সম্পর্কের এক অনন্য নজির হিসেবে গণ্য হচ্ছে।