অহংকার হেরে গেল ভালোবাসার কাছে! ২ বছর পর মুখোমুখি হতেই ঘটলো এক আশ্চর্য ঘটনা

“আমি ওকে ছেড়ে চলে এসেছিলাম… কিন্তু আমার মন কোনোদিনও ওর থেকে দূরে যায়নি। মাঝেমধ্যে আমরা সম্পর্কের চেয়ে নিজের জেদ আর অহংকারকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলি। তারপর সময় আমাদের শিখিয়ে দেয় যে—প্রকৃত ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না, তা শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করে।”
বিয়ের সাত বছর পর যখন আমি আমার স্বামী ‘আরভ’-এর বাড়ি ছেড়ে চলে আসি, তখন ভেবেছিলাম আমাদের পথ হয়তো চিরতরে আলাদা হয়ে গেছে। সেদিন সকালে ছোট একটা ব্যাগে নিজের জামাকাপড় গুছিয়ে, আলমারিতে থাকা আমাদের বিয়ের ছবিটার দিকে শেষবার তাকিয়ে, আর পিছন ফিরে তাকাইনি। চোখে জল ছিল ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর জমে ছিল একরাশ অভিমান আর রাগ।
আরভ কিন্তু খারাপ মানুষ ছিল না। ওর কোনো নেশা ছিল না, পরকীয়া ছিল না, কোনোদিন আমার গায়ে হাতও তোলেনি। কিন্তু মাঝেমধ্যে সম্পর্ক কোনো বড় ভুলের জন্য নয়, বরং হাজারটা ছোট ছোট অবহেলার কারণে ভেঙে যায়। আমাদের মধ্যে কথা বলা একপ্রকার বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। একই ছাদের নিচে থেকেও আমরা দুজন যেন দুজনার কাছে অচেনা হয়ে গিয়েছিলাম। মেলা মেশার অভাব আর নীরবতা একসময় আমাদের মাঝে এক মস্ত বড় পাঁচিল তুলে দিয়েছিল। একদিন রাতে চরম অশান্তির পর আমি রাগে বলেছিলাম, “তোমার সাথে আমি আর একটা মুহূর্তও থাকব না।” ও-ও রেগে বলেছিল, “যেতে চাইলে চলে যেতে পারো।” ব্যস, আমি চলে এলাম। ভেবেছিলাম ও আমাকে আটকাবে, কিন্তু ও আটকায়নি। অহংকারের বশে আমিও আর ফিরে যাইনি। বাপের বাড়ি চলে আসার কয়েক মাস পর চাকরির সূত্রে অন্য শহরে শিফট হয়ে যাই।
দেখতে দেখতে দুটো বছর কেটে গেল। এই দু-বছরে আমাদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি, কোনো মেসেজ বা ফোন কলও না। কিন্তু ভাগ্য যে আমাদের জন্য অন্য একটা নাটক লিখে রেখেছিল, তা কে জানত!
সেদিন অফিসের কাজে একটা দূরপাল্লার ট্রেনে যাচ্ছিলাম। কামরায় বেশ ভিড় ছিল। আমি জানলার ধারে বসে বাইরের দিকে তাকিয়েছিলাম। আচমকা আমার সামনের সিটে একজন এসে ব্যাগ রাখলেন। আমি স্বাভাবিকভাবেই মুখ তুলে তাকালাম এবং মুহূর্তের মধ্যে আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল!
আমার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে ছিল আরভ! দীর্ঘ দুটো বছর পর!
আমরা দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইলাম। মনে হলো যেন সময় থমকে গেছে। ওর চুলে দু-একটা পাক ধরেছে, চোখে-মুখে গাম্ভীর্য। ট্রেন চলতে শুরু করার বেশ কিছুক্ষণ পর আমাদের মধ্যে জড়তা কাটল। প্রথমে চাকরি, তারপর পরিবার এবং শেষে পুরোনো দিনের গল্প আসতেই কখন যে আমরা দুজন একসাথে হেসে উঠলাম, বুঝতেই পারিনি। একসময়ের চেনা সেই হাসিগুলো যেন আবার ফিরে এল।
রাত বাড়লে ট্রেনের আলো ডিম করে দেওয়া হলো। যাত্রীরা প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছেন। আরভ জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে খুব মৃদুস্বরে বলল, “তুমি চলে যাওয়ার পর বাড়িটা বড্ড ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম তুমি রাগ কমলে ঠিক ফিরে আসবে।” ওর চোখে তখন জলের আভাস। আমি আর চেপে রাখতে না পেরে নিজের মনের সত্যিটা উগরে দিয়ে বললাম, “আর আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আসবে।”
আমরা দুজন দুজনের দিকে তাকালাম এবং একসাথে হেসে ফেললাম। বুঝতে পারলাম, যে সম্পর্কটা শেষ হয়ে গেছে বলে আমরা ধরে নিয়েছিলাম, তা আসলে শেষ হয়নি। আমরা আসলে নিজেদের অহংকারের জেলে বন্দি হয়েছিলাম। সেই রাতে আমরা দু-বছরের জমে থাকা সমস্ত অভিমান, সমস্ত না বলা কথা মন উজাড় করে ভাগ করে নিলাম। সকাল হতেই মনের সব ভারী বোঝা যেন নেমে গেল।
যখন ট্রেন শেষ স্টেশনে পৌঁছাল, আমাদের দুজনের দুটো আলাদা দিকে যাওয়ার কথা ছিল। আমি প্ল্যাটফর্মে নামলাম, ও-ও নামল। কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর আরভ আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমরা কি আবার নতুন করে আমাদের জীবনটা শুরু করতে পারি?”
আমার বুকের স্পন্দন বেড়ে গেল। গত দুটো বছর ধরে এই একটা প্রশ্নই তো আমি শুনতে চেয়েছিলাম! চোখে জল নিয়ে হেসে বললাম, “ভাগ্য বোধহয় আমাদের এটাই বোঝাতে চাইল যে, কিছু সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার জন্য নয়, আরও একটু বেশি যত্ন করে আগলে রাখার জন্যই তৈরি হয়।”
আরভ দু-বছর পর আবার আমার হাতটা ধরল। আর এবার, আমি সেই হাতটা আর ছেড়ে দিইনি। সেদিন বুঝলাম, ভালোবাসা কোনো বড় বড় প্রতিশ্রুতির মধ্যে থাকে না। ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে এমন একজন মানুষের মধ্যে, যে বহু বছর পর দেখলেও আপনার মুখে ঠিক আগের মতোই চেনা হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারে। আমি আমার স্বামীকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু নিয়তি আমাদের আবার মিলিয়ে দিল। তবে এবার আমরা একে অপরকে নয়, আমাদের মাঝখানে থাকা ‘অহংকার’টাকে চিরতরে ছেড়ে দিলাম।