রোজ ১৫০ টাকার ‘গুপ্ত কর’, প্রতিবাদ করলেই বাস জব্দ! অবশেষে শ্রীঘরে কাটোয়ার দাপুটে তৃণমূল নেতা

কাটোয়া: বাস মালিক সংগঠনের টাকা তছরুপ, তোলাবাজি এবং বাসের পারমিট পাইয়ে দেওয়ার নামে বিপুল টাকার দুর্নীতির অভিযোগে অবশেষে গ্রেফতার হলেন তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের প্রভাবশালী নেতা নারায়ণ চন্দ্র সেন ওরফে নারু সেন। শনিবার রাতে পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া থানার পুলিশ তাঁর স্টেশনবাজার এলাকার বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাটোয়ার পরিবহন মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। রবিবার ধৃত নেতাকে কাটোয়া মহকুমা আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তাঁকে ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন।
টাকা ফেরত চাইতে যেতেই তুলকালাম:
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার বেশ কয়েকজন বাস মালিক বকেয়া টাকার হিসাব ও টাকা ফেরতের দাবিতে নারু সেনের বাড়িতে চড়াও হন। সেই সময় দু’পক্ষের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয় এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে কাটোয়া থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং নারু সেনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে একাধিক ভুক্তভোগী বাস মালিক থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে পুলিশ তাঁকে প্রথাগতভাবে গ্রেফতার করে।
দুর্নীতির খতিয়ান রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো:
একাধিক বাস মালিকের অভিযোগ, হাতবদল হওয়া বাসের পারমিটে নতুন মালিকের নাম পরিবর্তন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারু সেন বহু মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়েছিলেন। ৩-৪ বছর কেটে গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি কোনও কাজ করেননি। পাওনা টাকা ফেরত চাইতে গেলে বাস মালিকদের প্রতিনিয়ত অপমান, গালিগালাজ এবং এলাকাছাড়া করার হুমকি দেওয়া হতো বলে অভিযোগ।
বাসস্ট্যান্ডে চলত রাজত্ব:
ভুক্তভোগী বাস মালিকদের দাবি, কাটোয়া বাসস্ট্যান্ড দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি বাস থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে ১৫০ টাকা করে তোলা আদায় করা হতো। বাস মালিক সুমন কুণ্ডু ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “২০০৫ সাল থেকে প্রতি বাস থেকে ১৫ টাকা করে সমিতির চাঁদা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এত বছরে সেই টাকার কোনও হিসাব দেওয়া হয়নি। বাকি ১৩৫ টাকা কীসের জন্য নেওয়া হতো, তাও আমরা জানি না।”
অপর এক বাস মালিক অরূপ পাল জানান, কোনও বাসকর্মী বা মালিক এই তোলা দিতে আপত্তি জানালে সংশ্লিষ্ট বাসটিকে স্ট্যান্ডে আটকে রাখা হতো এবং রুটে চলতে দেওয়া হতো না। ফলে ব্যবসার ক্ষতির আশঙ্কায় এতদিন কেউ মুখ খোলার সাহস পাননি।
পরিবহন কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, শাসকদলের ঘনিষ্ঠ নেতা হওয়ায় এতদিন নারু সেনের বিরুদ্ধে পুলিশ-প্রশাসন কোনও পদক্ষেপ করেনি। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর ভুক্তভোগীরা সাহস ফিরে পেয়েছেন এবং দলে দলে এসে অভিযোগ জানাতে শুরু করেছেন। যদিও নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগই অস্বীকার করে ধৃত নেতা দায়সারাভাবে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ আনা হয়েছে আগে তা দেখব, তারপর মন্তব্য করব।” পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং এই চক্রে আর কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে।