এআই দুনিয়ায় সেকেলে শিক্ষানীতি একঝটকায় বদলে দিল চিন! কোথায় দাঁড়িয়ে ভারত?

এআই দুনিয়ায় সেকেলে শিক্ষানীতি একঝটকায় বদলে দিল চিন! কোথায় দাঁড়িয়ে ভারত?

বিএ, বিকম, বিএসসি কিংবা রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান বা সমাজ বিজ্ঞানের পাঠ শেষে হাতে আসবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক টুকরো শংসাপত্র— প্রথাগত এই শিক্ষার মাধ্যমে পেশাগত তথা সামাজিক প্রতিষ্ঠা পাওয়ার দিন এবার দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সেমিকন্ডাক্টর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর এই আধুনিক যুগে পাঠক্রম নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন করে ভাবার সময় এসে গিয়েছে। যুগের এই অমোঘ দাবি মেনে নিয়ে ইতিমধ্যেই নিজেদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে চিন। কিন্তু বৈশ্বিক এই প্রতিযোগিতায় ভারত ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে?

চিনের শিক্ষানীতিতে নজিরবিহীন সার্জারি

বিগত ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নিজেদের দেশের উচ্চশিক্ষার আঙিনা থেকে প্রায় ১২,২০০টি সেকেলে স্নাতক ডিগ্রির পাঠক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে শি জিনপিংয়ের দেশ। তার বদলে যুগোপযোগী ও সম্পূর্ণ নতুন ১০,২০০টি আধুনিক কোর্স চালু করা হয়েছে।

যে সমস্ত প্রথাগত পাঠক্রমে পুরোপুরি ইতি টানা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে:

  • কলা ও মানববিদ্যা (Arts and Humanities)
  • বিভিন্ন বিদেশি ভাষা
  • চিরাচরিত ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজমেন্ট কোর্স

এই সমস্ত সেকেলে বিষয়ের জায়গায় চিন এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, উন্নত কম্পিউটিং এবং রোবোটিকসের মতো আধুনিক শিল্প ও বাণিজ্যের প্রধান পথরেখাগুলিকে। দূরদর্শী চিন যখন এআই বিশ্বকে স্বাগত জানিয়ে নিজেদের শিক্ষানীতি আমূল বদলে ফেলছে, ভারত কিন্তু এখনও অনেকাংশে প্রাচীনপন্থী মানসিকতাতেই আটকে রয়েছে।

শিক্ষানীতির আড়ালে চিনের এক সুগভীর অর্থনৈতিক কৌশল

মনে রাখা দরকার, চিনের অ্যাকাডেমিক কোর্সের এই ব্যাপক রদবদল আসলে কেবল শিক্ষানীতির বদল নয়, এটি তাদের একটি সুগভীর অর্থনৈতিক কৌশলও বটে। বেজিং চাইছে তাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এমন সব অত্যাধুনিক শিল্পের জন্য ‘প্রতিভা তৈরির কারখানা’ হয়ে উঠুক, যেগুলি আগামী দশকগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করবে। এখন এই প্রযুক্তিগত বিষয়গুলি চিনের কাছে কোনও বিশেষ ক্ষেত্র নয়, বরং জাতীয় অগ্রাধিকার।

ভারতের মতোই চিনও বর্তমানে যুবকদের অর্জিত ডিগ্রি এবং কর্মসংস্থানের বাজারের চাহিদার মধ্যে বাড়তে থাকা এক বিশাল অসামঞ্জস্যের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ স্নাতক শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও, উপযুক্ত দক্ষতার অভাবে তাদের অনেকের পক্ষেই নিজেদের যোগ্যতার সঙ্গে মানানসই কাজ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এই ডিগ্রি বনাম দক্ষতার ফারাক ঘোচাতেই চিনের এই খোলনলচে বদল।

ভারতের সমস্যা আরও গভীর ও উদ্বেগজনক

চিন যেখানে ভবিষ্যতের কথা ভেবে দ্রুত নিজেদের রূপান্তর ঘটাচ্ছে, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে প্রতি বছর এখনও হাজার হাজার প্রথাগত ডিগ্রিধারী যুবক-যুবতী বেরোচ্ছেন। ফলে বড়সড় প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতের আধুনিক কাজের জগতের জন্য আমাদের দেশের ছাত্রছাত্রীরা কি আদেও তৈরি? নাকি ডিগ্রিধারী যুবকের নামে আসলে লক্ষ লক্ষ এমন কর্মী তৈরি করছে এই সেকেলে শিক্ষানীতি, এআই যুগে যাদের কাজের ধরণই বদলে যাবে?

ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি উদ্বেগজনক দিক সামনে আসে:

  • কেবলমাত্র সরকারি চাকরির প্রবেশদ্বার: প্রতি বছর দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী বিএ, বিকম ও বিএসসি কোর্সে ভর্তি হচ্ছেন। কিন্তু অধিকাংশের কাছেই এই ডিগ্রি কোনও পেশাজীবনের সুনির্দিষ্ট পথ নয়, কেবলমাত্র সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বসার একটি নূন্যতম যোগ্যতা মাত্র।
  • শূন্যপদের তুলনায় বেকারত্বের পাহাড়: সরকারি চাকরির মোট শূন্য আসনের তুলনায় ডিগ্রিধারী বেকার যুবকদের সংখ্যা এখন কয়েক হাজার গুণ বেশি।
  • চাহিদা ও জোগানের বিস্তর ফারাক: প্রযুক্তি যেভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন রূপ দিচ্ছে, সেখানে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের পুথিগত পড়াশোনা এবং আধুনিক নিয়োগকর্তাদের বাস্তব চাহিদার মধ্যকার ব্যবধানটিকে উপেক্ষা করা ক্রমশ কঠিন ও বিপজ্জনক হয়ে পড়ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *