১৫ কোটি না দিলে আটকে যাবে জয়েনিং! নিয়োগ দুর্নীতিতে অভিষেকের বিরুদ্ধে সিবিআই চার্জশিটে বিস্ফোরক দাবি

পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি (Primary Recruitment Scam) মামলায় এবার ইডি (ED) ও সিবিআই (CBI)-এর রাডারে উঠে এলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দায়ের করা একটি সাম্প্রতিক সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটকে হাতিয়ার করেই সিজিও কমপ্লেক্সে অভিষেককে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়। সিবিআই-এর চার্জশিটে ধৃত সুজয়কৃষ্ণ ভদ্রের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া একটি গোপন অডিও রেকর্ডিংয়ের সূত্র ধরে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে, তা রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
সুজয়কৃষ্ণের গোপন বৈঠক ও টাকার ভাগ নিয়ে ‘দ্বন্দ্ব’
২০১৭ সালের প্রাথমিক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ধৃত সুজয়কৃষ্ণ ভদ্র (কালীঘাটের কাকু) একসময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও ডানহাত বলে পরিচিত ছিলেন। সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, সুজয়কৃষ্ণের বাড়িতেই এক অত্যন্ত গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নিয়োগ দুর্নীতির অন্যতম অভিযুক্ত কুন্তল ঘোষ এবং শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বহিষ্কৃত নেতারা।
সিবিআই চার্জশিটের তথ্য অনুযায়ী:
- টাকার ভাগ নিয়ে ক্ষোভ: বৈঠকে সুজয়কৃষ্ণ বাকিদের জানান, প্রাথমিক নিয়োগে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় যে কোটি কোটি টাকা তুলছেন, তা অভিষেকের কানে পৌঁছে গিয়েছে। পার্থবাবু একা কেন সমস্ত টাকা নিচ্ছেন এবং সেই বিপুল অর্থের ভাগ কেন তাঁর কাছে পৌঁছায়নি, তা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন অভিষেক।
- পার্থ-অভিষেক সংঘাত: নিয়োগ দুর্নীতির কোটি কোটি টাকার ভাগাভাগি নিয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৫ কোটির দাবি ও চাকরিপ্রার্থীদের গ্রেফতারির ‘হুমকি’
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার চার্জশিটে সবচেয়ে বড় এবং বিস্ফোরক দাবিটি করা হয়েছে বেআইনি চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সংক্রান্ত। চার্জশিট অনুযায়ী, যে সমস্ত প্রার্থীদের ইতিমধ্যেই বেআইনিভাবে নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়ে গিয়েছিল, তাঁদের চাকরি চূড়ান্ত করার জন্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি ১৫ কোটি টাকা দাবি করেছিলেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে:
- জয়েনিং আটকে দেওয়ার হুঁশিয়ারি: দাবি মতো এই ১৫ কোটি টাকা না দেওয়া হলে প্রতিটি চাকরিপ্রার্থীর নিয়োগ বা ‘জয়েনিং’ সম্পূর্ণ আটকে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
- গ্রেফতারির ভয়: কেবল জয়েনিং আটকানোই নয়, টাকা না মিললে বেআইনিভাবে চাকরি পেতে যাওয়া প্রার্থীদের কেন্দ্রীয় সংস্থাকে দিয়ে গ্রেফতার করানোর ভয়ও দেখানো হয়েছিল। এর পরবর্তীতে সুজয়কৃষ্ণ মারফত আরও ২০ কোটি টাকা অভিষেকের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা ছিল।
কীভাবে ভাগ হতো দুর্নীতির ১০০ কোটি টাকা?
সুজয়কৃষ্ণ ভদ্রের অডিও রেকর্ডিং এবং চার্জশিটের বয়ান অনুযায়ী, বাজার থেকে চাকরি বিক্রি করে সর্বমোট ১০০ কোটি টাকা তোলার এক বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বা ‘টার্গেট’ বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। আর এই বিপুল পরিমাণ টাকা তোলার মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কুন্তল ঘোষদের।
সংগৃহীত এই ১০০ কোটি টাকা যেভাবে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার ছক কষা হয়েছিল:
- অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাগ: ২০ কোটি টাকা
- পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ভাগ: ২০ কোটি টাকা
- মানিক ভট্টাচার্যের ভাগ: ২০ কোটি টাকা
- অবশিষ্ট ৪০ কোটি টাকা: সুজয়কৃষ্ণ ভদ্র এবং তাঁর সহযোগীরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার নিখুঁত পরিকল্পনা করেছিলেন।
প্রাথমিকের ১৫ মিনিটের ওই অডিও ক্লিপে বারবার উচ্চারিত হওয়া ‘অভিষেক’ নামটি আসলে তৃণমূলের এই শীর্ষ সাংসদেরই কি না, তা নিশ্চিত করতেই মূলত ইডির গোয়েন্দারা তাঁকে তলব করেন। লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস এবং অভিষেকের অন্যান্য সহযোগী সংস্থাগুলির আর্থিক লেনদেনের নথির সাথে এই চার্জশিটের বয়ান মিলিয়ে দেখছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা।