বড়লোকদের কোটি কোটি ঋণ আর আমজনতাকে হয়রানি! ব্যাংকগুলোর ওপর মারাত্মক ক্ষুব্ধ সুপ্রিম কোর্ট

বড়লোকদের কোটি কোটি ঋণ আর আমজনতাকে হয়রানি! ব্যাংকগুলোর ওপর মারাত্মক ক্ষুব্ধ সুপ্রিম কোর্ট

দেশের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক এসবিআই (SBI) সহ অন্যান্য ব্যাংকগুলির ঋণ বণ্টন নীতির তীব্র সমালোচনা করল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ, ব্যাংকগুলি সাধারণ মানুষকে সামান্য ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়ার নামে চরম ‘হয়ানি’ করে, অথচ বড় বড় শিল্পপতি ও প্রভাবশালী সংস্থাগুলিকে যথাযথ যাচাই ছাড়াই কোটি কোটি টাকার ঋণ পাইয়ে দেয়, যা পরবর্তীকালে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। ব্যাংকিং ক্ষেত্রের এই উদ্বেগজনক বৈষম্য নিয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে শীর্ষ আদালত।

৮ কোটির ঋণ নিয়ে একটিও কিস্তি নয়! হরিয়ানার মামলার প্রেক্ষাপট

হরিয়ানার একটি বেসরকারি সংস্থাকে কেন্দ্র করে চলা মামলার শুনানিতে ব্যাংকগুলির এই চরম উদাসীনতা ও গাফিলতির রূপটি সামনে এসেছে। বিচারপতি হাসানউদ্দিন আমানুল্লাহ এবং বিচারপতি আর. মহাদেবনের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলছিল।

মামলার মূল বিবরণী নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ঋণ ও খেলাপি: ২০১৯ সালে হরিয়ানার ওই সংস্থাটি স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (SBI) থেকে ৮.০৯ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিল। কিন্তু ঋণ পাওয়ার পর সংস্থাটি ব্যাংকে একটিও কিস্তি পরিশোধ করেনি। ফলে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই অ্যাকাউন্টটি খেলাপি বা এনপিএ (NPA) হিসেবে ঘোষিত হয়।
  • আদালতে কো ম্পা নির আর্জি: দীর্ঘ ছয় বছর পর ওই খেলাপি সংস্থাটি আদালতের দ্বারস্থ হয়ে জানায়, তারা এখন শুধুমাত্র ঋণের মূলধনটুকু ফেরত দিতে ইচ্ছুক।
  • আদালতের প্রত্যাখ্যান: সুপ্রিম কোর্ট সংস্থার এই বিলম্বিত ও অযৌক্তিক দাবিকে সম্পূর্ণ খারিজ করে দেয়। আদালত ব্যাংককে ওই কো ম্পা নির সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার স্পষ্ট অনুমতি দিলেও, এই বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের পেছনে থাকা ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

আমজনতার জন্য কঠিন নিয়ম আর ধনকুবেরদের অন্ধ ছাড়

সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ আক্ষেপ প্রকাশ করে জানায় যে, বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সাধারণ নাগরিক এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির মানুষের জন্য ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও ক্লান্তিকর।

শীর্ষ আদালতের কড়া পর্যবেক্ষণ:

  • সাধারণ মানুষের হয়রানি: একজন সাধারণ মানুষ যখন নিজের ব্যক্তিগত বা জরুরি প্রয়োজনে অত্যন্ত ছোট অঙ্কের কোনও ঋণ নিতে আসেন, তখন তাঁকে এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কঠোর নিয়মকানুনের বেড়াজালে পড়ে বহু ক্ষেত্রে তা সাধারণ মানুষের কাছে চরম হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
  • বড় সংস্থাকে কোটি কোটি বিলি: অপরদিকে, বড় বড় প্রভাবশালী কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম অবহেলা ও অন্ধ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। ঋণগ্রহীতার যোগ্যতা বা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা সঠিকভাবে যাচাই না করেই কোটি কোটি টাকা অনুমোদন করা হচ্ছে।

এসবিআই কর্মকর্তাদের গাফিলতি নিয়ে শীর্ষ আদালতের কড়া হুঁশিয়ারি

আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, ঋণ পাওয়ার পরপরই হরিয়ানার ওই কো ম্পা নির খেলাপি হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে, লোন অনুমোদনের আগে এসবিআই কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ওই সংস্থার আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে কোনওরকম যথাযথ তদন্ত বা স্ক্রুটিনি করেননি।

শুনানিতে এসবিআই-এর পক্ষে প্রতিনিধিত্বকারী অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল (ASG) অর্চনা পাঠক দাভেকে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, তিনি যেন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এই বিষয়ে আদালতের গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষের বার্তা পৌঁছে দেন।

বিচারপতিদের বেঞ্চ স্পষ্ট করে দেয়, তারা ব্যাংকিং নিয়মকানুন বা বিধি-বিধান শিথিল করার কথা বলছে না। বরং ঋণ বিতরণ এবং আদায় প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সহজ, ন্যায্য ও মানবিক করা উচিত যাতে সাধারণ ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারেন। এই মামলায় সরাসরি কোনও নতুন নির্দেশ বা রুল জারি না করলেও, ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলির এমন উদাসীন ও পক্ষপাতমূলক মনোভাবের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *