দেশের ৪০% বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি হচ্ছে এক রাজ্যেই! এবার এশিয়ার বৃহত্তম ইভি হাব হওয়ার লক্ষ্য

ভারতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (EV) চাহিদা রকেটের গতিতে বাড়ছে। পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ এখন ব্যাটারিচালিত গাড়ির দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। ২০২৬ সালের মে মাসে দেশের বাজারে মোট যানবাহনের মধ্যে ইভি-র অংশীদারিত্ব প্রথমবারের মতো ১০ শতাংশের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে, যা এই বিপ্লবের স্পষ্ট ইঙ্গিত। আর ভারতের এই বৈদ্যুতিক গাড়ি বিপ্লবের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে দক্ষিণ ভারতের রাজ্য তামিলনাড়ু। বর্তমানে দেশের মোট ইভি উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বৈদ্যুতিক দুই চাকার যানের ৫০ শতাংশের বেশি একা তামিলনাড়ুতেই তৈরি হচ্ছে। ফলে রাজ্যটি ইতিমধ্যেই ভারতের বৃহত্তম বৈদ্যুতিক গতিশীলতা উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
দেশী-বিদেশী নামী সংস্থাগুলির মূল গন্তব্য তামিলনাড়ু
অটোমোবাইল শিল্পের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তামিলনাড়ু এখন দ্রুত বৈদ্যুতিক গাড়ির হাব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে। এই রূপান্তর দেশীয় ও বিদেশী উভয় খাতের বড় বড় সংস্থাকে ব্যাপকভাবে আকর্ষণ করেছে।
বর্তমানে এই রাজ্যে কর্মরত প্রধান সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলি হলো:
- দু’চাকার ইভি: ওলা ইলেকট্রিক, টিভিএস মোটর, আথার এনার্জি, গ্রিভস, রাপ্তি এনার্জি এবং রয়্যাল এনফিল্ডের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলি এখানে বিপুল পরিমাণ দু’চাকার বৈদ্যুতিক যান তৈরি করছে।
- চার চাকার ইভি ও ভারী যান: হুন্ডাই, বিওয়াইডি (BYD) এবং ভিয়েতনামের বিখ্যাত সংস্থা ভিনফাস্টের মতো গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলি এই রাজ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের জন্য বড়সড় বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি সুইচ মোবিলিটি এবং মন্টরা ইলেকট্রিক রাজ্যটিকে বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাক উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলছে।
- গবেষণা ও উন্নয়ন: চেন্নাই-ভিত্তিক মাহিন্দ্রা রিসার্চ ভ্যালি এবং আইআইটি মাদ্রাজ (IIT Madras)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলি ইভি গবেষণা, ডিজাইন এবং প্রকৌশল ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করছে।
পুনে-বেঙ্গালুরুর থেকে প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকার চ্যালেঞ্জ
উৎপাদনে তামিলনাড়ু শীর্ষে থাকলেও প্রযুক্তিগত কিছু ক্ষেত্রে রাজ্যটি এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কারখানা গড়ে তোলাই শেষ কথা নয়, ইভি প্রযুক্তির মূল উপাদানগুলিতে স্বনির্ভর হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে ভারত ব্যাটারি সেল, পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স এবং উন্নত ভেহিকল সফটওয়্যারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ইভি উপাদানের উন্নয়ন ও প্রকৌশলের (R&D) দিক থেকে পুনে এবং বেঙ্গালুরুর মতো শহরগুলি এখনও তামিলনাড়ুর চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (BMS), ভেহিকল সফটওয়্যার এবং ফার্মওয়্যার উন্নয়নের ক্ষেত্রে তামিলনাড়ুকে আরও কাজ করতে হবে।
এমএসএমই এবং স্থানীয় যন্ত্রাংশের জোগান বাড়ানোর তাগিদ
একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, সরকারের মূল নজর এখন বড় বিনিয়োগকারী এবং গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার (GCC) আকর্ষণের দিকে। এর ফলে অটো শিল্পের আসল মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প (MSME) এবং স্থানীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীরা পর্যাপ্ত সমর্থন পাচ্ছে না, যার জেরে স্থানীয় সাপ্লাই চেইন কিছুটা দুর্বল রয়েছে। ইভি শিল্পের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো ব্যাটারি সেল উৎপাদন। যদিও ওলা ইলেকট্রিকের মতো কো ম্পা নিগুলি এই ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগ করছে, তবুও এই শিল্পটি এখনও প্রাথমিক স্তরেই রয়েছে। তবে আশার কথা হলো, মোটর কন্ট্রোলার, ইনভার্টার, অনবোর্ড চার্জার এবং ট্র্যাকশন মোটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরিতে সোনা কমস্টারের মতো ভারতীয় সংস্থাগুলির সক্ষমতাও দ্রুত বাড়ছে।
সমগ্র এশিয়ার সেরা হওয়ার সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামিলনাড়ুর এখন শুধু গাড়ি অ্যাসেম্বল বা সাধারণ কারখানা স্থাপনের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত হবে না। রাজ্যটির উচিত সফটওয়্যার উন্নয়ন, সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি প্রযুক্তি, রিসাইক্লিং শিল্প এবং কাঁচামাল সরবরাহের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া। তামিলনাড়ু যদি উন্নত ইলেকট্রনিক্স ও ভেহিকল সফটওয়্যারে নিজস্ব শক্তিশালী প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করতে পারে, তবে আগামী বছরগুলিতে এটি কেবল ভারতেই নয়, সমগ্র এশিয়ার বৃহত্তম ইভি এবং ডিপ-টেক হাবে (Deep-Tech Hub) পরিণত হতে পারে।