মমতা নাকি বিদ্রোহী সাংসদ? আইনি লড়াই হলে শেষ পর্যন্ত কার দখলে থাকবে আসল তৃণমূল!

মমতা নাকি বিদ্রোহী সাংসদ? আইনি লড়াই হলে শেষ পর্যন্ত কার দখলে থাকবে আসল তৃণমূল!

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) সম্ভবত তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইনি ও রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। লোকসভার ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জনের দলত্যাগ এবং রাজ্যের ৬০ জনেরও বেশি বিধায়কের বিদ্রোহ কেবল একটি রাজনৈতিক ধাক্কাই নয়, এটি সরাসরি দলের অস্তিত্ব এবং ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়াফুল’ প্রতীক রক্ষার এক মরণপণ লড়াই। লড়াই যদি নির্বাচন কমিশন এবং আদালত পর্যন্ত গড়ায়, তবে কার পাল্লা ভারী থাকবে? দল কার হাতে থাকবে? দেখে নিন এর আসল আইনি অঙ্ক।

দলত্যাগ বিরোধী আইন এবং বিদ্রোহীদের ‘একত্রীকরণ’ কৌশল

দিল্লিতে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কাকলী ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ লোকসভার স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়ে ত্রিপুরার একটি অখ্যাত দল ‘ন্যাশনালিস্টসি জেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI)-র সাথে একীভূত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

আইনের মারপ্যাঁচ:

১৯৮৫ সালের সংবিধানের দশম তফসিল (দলত্যাগ বিরোধী আইন) অনুযায়ী, কোনও সাংসদ বা বিধায়কের পদ তখনই রক্ষা পাবে যদি মূল দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য অন্য দলে যোগ দেন। লোকসভায় তৃণমূলের ২৮ জন সাংসদের দুই-তৃতীয়াংশের (অর্থাৎ ১৯ জন) কোটা পার করে ২০ জন সাংসদ এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়ায় তারা আপাতত অযোগ্যতা এড়াতে পেরেছেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল সংগঠনের সম্মতি ছাড়া এই ধরণের একত্রীকরণ আদালতে ‘শেল কো ম্পা নি’র মতো এক নিছক আইনি কৌশল হিসেবে বিবেচিত হবে, যা আদালতের স্ক্রুটিনিতে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন।

মমতার বড় ঢাল সুপ্রিম কোর্টের ৩টি ঐতিহাসিক রায়

আইনি লড়াই শুরু হলে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে চলেছে সুপ্রিম কোর্টের অতীতের ৩টি যুগান্তকারী রায়। প্রাক্তন লোকসভা মহাসচিব পিডিটি আচার্য এবং প্রবীণ আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভীর মতো বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায়গুলি বিদ্রোহীদের পথ আটকে দেবে:

  • সুভাষ দেশাই বনাম মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল (২০২৩): শিবসেনা মামলার এই ঐতিহাসিক রায়ে সর্বোচ্চ আদালতের সাংবিধানিক বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছিল, ‘মূল রাজনৈতিক দল’ (Political Party) এবং ‘আইনসভা দল’ (Legislative Party) দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বা বিধানসভায় আসীন ব্যক্তিরা নিজেদেরকে সমগ্র দলের প্রভু বলে মনে করতে পারেন না। হুইপ জারি করার এবং দলের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আসল কর্তৃত্ব মূল সংগঠন এবং তার সভাপতির (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) হাতেই ন্যস্ত।
  • ডঃ মহাচন্দ্র প্রসাদ সিং (২০০৪) ও রাজেন্দ্র সিং রানা (২০০৭) মামলা: এই দুই মামলায় আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, দুটি রাজনৈতিক দলের একত্রীকরণ অবশ্যই সাংগঠনিক স্তরে হতে হবে, কেবল কয়েকজন সাংসদ বা বিধায়কের স্তরে নয়। মূল দল যদি একীভূত হতে অনিচ্ছুক হয়, তবে শুধুমাত্র সাংসদদের অন্য দলে স্থানান্তর করাকেও “দলত্যাগ” বা ডিফেকশন হিসেবেই গণ্য করা হবে।
  • রবি নায়েক বনাম ভারত সরকার (১৯৯৪): এই রায়ে আদালত স্পষ্ট করেছিল যে, যদি কোনও জনপ্রতিণির কার্যকলাপ তাঁর নিজের দলের নীতি ও মূল নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যায়, তবে তা আইনত ‘স্বেচ্ছায় পদত্যাগ’ হিসেবে গণ্য হবে।

নির্বাচন কমিশনের ‘সাদিক আলী’ পরীক্ষা ও প্রতীকের ভবিষ্যৎ

বিদ্রোহী শিবির জুলাই মাসে নির্বাচন কমিশনের (EC) দ্বারস্থ হয়ে নিজেদের ‘প্রকৃত তৃণমূল’ দাবি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই ক্ষেত্রে কমিশন ১৯৬৮ সালের নির্বাচনী প্রতীক (সংরক্ষণ ও বরাদ্দ) আদেশের ১৫ নং ধারা এবং ১৯৭১ সালের বিখ্যাত ‘সাদিক আলী বনাম নির্বাচন কমিশন’ মামলার ৩টি প্রধান মাপকাঠির ভিত্তিতে দাবিগুলি যাচাই করবে:

১. আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতা

সংসদ ও বিধানসভায় কোন গোষ্ঠীর সঙ্গে কতজন প্রতিনিধি আছেন, কমিশন তা খতিয়ে দেখে। লোকসভার ২০ জন সাংসদ এবং বিধানসভার ৬০ জনের বেশি বিধায়ক বিদ্রোহীদের পক্ষে থাকায় তারা এখানে শক্তিশালী। উপরন্তু, বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু ইতিমধ্যেই ঋতব্রত ব্যানার্জীকে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি দিয়েছেন, যদিও এই সিদ্ধান্তকে কলকাতা হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করেছেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

২. সাংগঠনিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা

কমিশন দেখে দলের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি, পদাধিকারী এবং জেলা সভাপতিদের মধ্যে কার প্রাধান্য রয়েছে। এই ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত শক্তিশালী, কারণ সর্বভারতীয় সংগঠনের ওপর এখনও তাঁদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে মহারাষ্ট্রের (শিবসেনা-এনসিপি) ক্ষেত্রে কমিশন সংগঠনের চেয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংখ্যাকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছিল, যা মমতার শিবিরের জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

৩. দলের সংবিধানের পরীক্ষা

কমিশন খতিয়ে দেখবে যে, দলের মধ্যে নতুন নেতৃত্বের দাবি বা বিদ্রোহ দলের অভ্যন্তরীণ নিয়মকানুন ও মূল সংবিধান মেনে হচ্ছে কি না। যেহেতু তৃণমূলের পুরো সাংগঠনিক কাঠামোই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে তৈরি, তাই বিদ্রোহীদের পক্ষে নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিজেদের ‘প্রকৃত তৃণমূল’ প্রমাণ করা কঠিন হবে।

প্রতীক কি তবে বাজেয়াপ্ত হবে?

যদি নির্বাচন কমিশন মনে করে যে উভয় পক্ষের দাবি অত্যন্ত জটিল এবং তাৎক্ষণিকভাবে কোনও এক পক্ষকে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব নয়, তবে তারা একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূলের নাম এবং তাদের বিখ্যাত ‘জোড়াফুল’ প্রতীক সাময়িকভাবে স্থগিত বা ফ্রিজ করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে নির্বাচনের জন্য উভয় পক্ষকেই সাময়িকভাবে নতুন নাম ও নতুন নির্বাচনী প্রতীক দেওয়া হবে।

ইতিমধ্যেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি পাঠিয়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি না দেওয়ার এবং সরকারি হুইপ মেনে চলার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে সাগরিকা ঘোষ ও কীর্তি আজাদের মতো তৃণমূল নেতারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নির্বাচন কমিশন বা স্পিকারের সিদ্ধান্ত বিপক্ষে গেলে তাঁরা অবিলম্বে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হবেন। আইনি লড়াই আদালতে মাস বা বছর ধরে চলতে পারে, কিন্তু তৃণমূল স্তরে আসল ক্ষমতা ও সাধারণ কর্মীদের সমর্থন যতক্ষণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকবে, ততক্ষণ জনগণের আদালতে মমতাই শেষ কথা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *