‘এত ডিম তখন থাকলে বাপ-ঠাকুরদা মরতো না!’ নেতাদের দিকে ডিম ছোড়ার খবরে আক্ষেপ আমলাশোলের

‘এত ডিম তখন থাকলে বাপ-ঠাকুরদা মরতো না!’ নেতাদের দিকে ডিম ছোড়ার খবরে আক্ষেপ আমলাশোলের

ঝাড়গ্রাম: আমলাশোলের গা থেকে আজও যেন অনাহারের গন্ধ মুছে যায়নি। সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষুব্ধ জনতার শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীদের লক্ষ্য করে ‘ডিম’ ছুড়ে মারার খবর পৌঁছেছে জঙ্গলমহলের এই প্রত্যন্ত গ্রামেও। কিন্তু নেতাদের দিকে ডিম ছোড়ার এই খবর আমলাশোলের শবরদের মনে কোনো আনন্দ নয়, বরং এক তীব্র অস্বস্তি ও আক্ষেপের জন্ম দিয়েছে। গ্রামে বসেই প্রবীণ ফুলমণি শবর, বেদনি শবরদের মনে হচ্ছে— ‘হায়! তখন যদি ডিমের এত জোগান থাকত, তবে হয়তো না খেয়ে মরতে হতো না আমাদের স্বজনদের।’

২০০৪ সালের সেই দগদগে ঘা আজও ভোলেনি বেলপাহাড়ির কোলে থাকা ছোট্ট গ্রাম আমলাশোল। অনাহার আর অপুষ্টির কারণে সে সময় সনাতন মুড়া, সময় শবর, মঙ্গলী শবর, নাথু শবর এবং শম্ভু শবর— এই পাঁচজনের মৃত্যুর অভিযোগে তোলপাড় হয়েছিল গোটা রাজ্য। মৃত নাথু শবরের অশীতিপর স্ত্রী ফুলমণি শবর আজও চোখে ভালো দেখেন না, কিন্তু স্মৃতি তাঁর টনটনে। ভাঙা মাদুরে বসে বলিরেখা জড়ানো মুখে এক চিলতে মলিন হেসে বললেন, “না গো বাবু, ভাত আর তরকারি খাই, ডিম কোথায় পাব?” স্বামী নাথুর মৃত্যুর কথা মনে করে আজও তাঁর স্পষ্ট দাবি, রাতে কোনো কোনো দিন সামান্য খাবার জুটত, কোনো দিন তা-ও নয়। না খেতে পেয়েই মারা যান তাঁর স্বামী।

যদিও তৎকালীন সরকারি প্রশাসন বা জেলাশাসক চন্দন সিংহ অনাহারে মৃত্যুর তত্ত্ব উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছিলেন, এদের মৃত্যু হয়েছিল অতিরিক্ত মদ্যপান বা যক্ষ্মার মতো রোগে। কিন্তু দেশ-বিদেশের গবেষকরা তো বটেই, গ্রামের মানুষও আজও এই সরকারি দাবি মানতে নারাজ।

ডিম ছোড়ার খবর শুনে খচখচ করছে মন:

আজকাল গ্রামে দু-একজনের স্মার্টফোনে বা টিভিতে যখন ফুলমণিরা দেখেন যে মানুষ ক্ষোভ মেটাতে নেতাদের দিকে ডিম ছুড়ছে, তখন তাঁদের বুকটা হু-হু করে ওঠে। ২০০৪ সালে অনাহারে মৃত সময় শবর ও মঙ্গলী শবরের পরিবারের সদস্য বেদনি শবর লতাপাতা কুড়িয়ে কোনোমতে দিন গুজরান করেন। রেশনের মোটা চালের ভাতে পেট ভরলেও ডিম আজও তাঁদের কাছে বিলাসিতা। ডিম ছোড়াছুড়ির খবর শুনে এক বুক কষ্ট নিয়ে বেদনি বলেন, “এখন তো শুনছি চারদিকে ডিম ছোড়াছুড়ি হচ্ছে। এত ডিম যদি তখন থাকত, আমার শ্বশুর আর ননদটাকে মরতে হতো না।”

একই সুর গ্রামের যুবক শুকদেবের গলাতেও। ৩৫ বছরের শুকদেব রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তিনি বলেন, “তখন ডিম কিনতে গেলে ঘাটশিলা বা বেলপাহাড়ির বাজারে যেতে হতো। এখন অবস্থা কিছুটা বদলেছে, তবে প্রতিদিন পাতে ডিম জোটে না আমাদের।”

দুই আমলাশোলের গল্প:

আজকের আমলাশোলে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। তৈরি হয়েছে আধুনিক হোম-স্টে। সেখানে শহরের বাবুদের জন্য ধামসা-মাদলের তালে বার্বিকিউ হচ্ছে, কাঠকয়লার আঁচে পুড়ছে আস্ত মুরগি। আর ঠিক তার অদূরেই কুঁড়েঘরের উনুনে ফুটছে রেশনের মোটা চালের ভাত। আজও আমলাশোলের মানুষের কাছে জীবনের চরমতম স্বপ্ন আর অমৃতের স্বাদ হলো— শালপাতায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, একটু নুন আর একটা আস্ত সেদ্ধ ডিম! যে ডিমের অপচয় দেখে আজ চোখ দিয়ে জল পড়ে জঙ্গলমহলের এই মানুষগুলোর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *