কলকাতা পুরসভায় ডিলিমিটেশন কি সত্যিই জরুরি? শুভেন্দুর সিদ্ধান্তকে তুলোধোনা করলেন বিকাশ!

কলকাতা পুরসভায় ডিলিমিটেশন কি সত্যিই জরুরি? শুভেন্দুর সিদ্ধান্তকে তুলোধোনা করলেন বিকাশ!

কলকাতা পুরসভার (KMC) আসন্ন নির্বাচন ও আগামী ৭ই ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন বোর্ড গঠনের ডেডলাইনের মাঝেই এবার মাথা চাড়া দিল ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বা ‘ডিলিমিটেশন’ বিতর্ক। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডিলিমিটেশনের এই বড়সড় ইঙ্গিতকে কেন্দ্র করে এবার রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র সংঘাতের আবহ তৈরি হলো। মুখ্যমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে এবং এর যৌক্তিকতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছেন কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র তথা প্রবীণ সিপিআইএম (CPIM) নেতা ও বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য।

বুথ ও ভোটারের ভারসাম্যহীনতার তত্ত্ব শুভেন্দুর

সম্প্রতি পুরসভায় এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতায় ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তার কথা জোরের সাথে তুলে ধরেন। ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত নিজে কাউন্সিলর থাকার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জানান যে, কলকাতার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভোটারের সংখ্যা ও বুথের বণ্টনে চরম অসামঞ্জস্য রয়েছে।

  • ভবানীপুরের উদাহরণ: মুখ্যমন্ত্রী জানান, তিনি নিজে যখন ভবানীপুর কেন্দ্রে লড়াই করেছিলেন, তখন লক্ষ্য করেছিলেন এখানকার ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডেই রয়েছে প্রায় ৪৯টি বুথ।
  • অন্যান্য ওয়ার্ডের চিত্র: এর বিপরীতে বহু ওয়ার্ড এমন রয়েছে যেখানে বুথের সংখ্যা মাত্র ১৫ থেকে ২০টি। ৮২ নম্বর ওয়ার্ডটির ভৌগোলিক পরিধিও অত্যন্ত বিশাল।

এই বিপুল জনসংখ্যা ও বুথের ভারসাম্য বজায় রাখতেই রাজ্য সরকারের সুপারিশে রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে দ্রুত ডিলিমিটেশন করানো প্রয়োজন বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন তিনি।

‘চটকদারি কাজ ও বিভাজনের রাজনীতি’, তোপ বিকাশের

মুখ্যমন্ত্রীর এই ডিলিমিটেশনের তত্ত্বকে চটকদারি ও বিভাজনমূলক রাজনীতি বলে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন প্রাক্তন মেয়র বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, জনসংখ্যা বা বুথের সামঞ্জস্য বিধান নয়, বরং এর আড়ালে অন্য কোনও রাজনৈতিক অভিসন্ধি রয়েছে নতুন সরকারের।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে সরাসরি নিশানা করে বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন:

“উনি পুরসভা সম্বন্ধে কতটুকু খোঁজখবর রাখেন? কারা ওঁকে ডিলিমিটেশন করার এই অদ্ভুত পরামর্শ দিয়েছেন? চটকদারি কাজ করতে করতে ভারতের যেমন সর্বনাশ করেছেন মোদীজি, ঠিক সেভাবেই যেটুকু বাকি আছে, এটুকু এবার শুভেন্দুবাবুকে দিয়ে করানো হবে। ওঁর মাথায় দেশটাকে ভাগ করার পরিকল্পনা ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। উনি কি পুরসভার স্বার্থে নাকি তথাকথিত হিন্দু এরিয়া বা দলিত এরিয়া খোঁজার জন্য এটা করতে চাইছেন?”

মৌলিক পরিষেবা ও বেআইনি নির্মাণ রুখতে পরামর্শ

প্রবীণ এই বাম নেতার দাবি, কলকাতা পুরসভা বর্তমানে একাধিক মৌলিক সমস্যা ও পরিকাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডিলিমিটেশনের মতো অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে সময় নষ্ট না করে সরকারের উচিত পুরসভার আসল সমস্যাগুলির সমাধান করা।

  • শূণ্যপদ ও পরিষেবা: পুরসভার বহু গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কর্মীদের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে রয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ ঠিকমতো পুর-পরিষেবা পাচ্ছেন না। নতুন প্রশাসনের উচিত আগে এই শূণ্যপদগুলি পূরণ করা।
  • পানীয় জলের সংকট: কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ এখনও পরিশ্রুত পানীয় জল ঠিকমতো পান না। বাম আমলের পর এই পরিষেবার আর কোনও বাস্তব অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
  • বেআইনি নির্মাণ: কলকাতা শহরের বুকে, বিশেষ করে বড়বাজারের মতো বাণিজ্যিক এলাকায় দেদার বেআইনি নির্মাণ গজিয়ে উঠছে। নতুন প্রশাসনের উচিত নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় সিলেক্টিভ উচ্ছেদ করে মানুষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি না করে, এই সব বড় বড় বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া।

ভারতের সংবিধানে বর্ণিত ‘থ্রি-টায়ার স্ট্রাকচার’ বা ত্রি-স্তরীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থাকে ভেঙে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রিকতা তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে বলেও নজিরবিহীন অভিযোগ তোলেন এই প্রবীণ আইনজীবী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *