বহিষ্কৃত ঋতব্রতকে কেন বিরোধী দলনেতা বাছলেন? স্পিকারকে অস্বস্তিকর প্রশ্ন হাইকোর্টের

রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা (LoP) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চলমান আইনি লড়াইয়ে এবার বিধানসভার স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে নজিরবিহীন প্রশ্ন তুলল কলকাতা হাইকোর্ট। বিধানসভার গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিন, এই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে স্পিকারের নিরপেক্ষতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে একগুচ্ছ অত্যন্ত অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুললেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণা রাও। মূল দল তৃণমূল কংগ্রেসের দাবিকে উপেক্ষা করে কীভাবে একজন ‘বহিষ্কৃত’ বিধায়ককে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মান্যতা দেওয়া হলো, তা নিয়ে আদালতের তীব্র প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে স্পিকারের আইনজীবীকে।

স্পিকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিচারপতির একগুচ্ছ কড়া প্রশ্ন

মামলার শুনানির সময় বিচারপতি কৃষ্ণা রাও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ তুলে স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন উত্থাপন করেন:

  • প্রথম আবেদন ঝুলিয়ে রাখার কারণ: গত ৯ মে তৃণমূলের পক্ষ থেকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার প্রথম চিঠি পাওয়ার পরও স্পিকার কেন তা ঝুলিয়ে রাখলেন? কেন দুই পক্ষকে ডেকে কোনও বৈঠক বা শুনানির ব্যবস্থা করা হলো না?
  • দ্বিতীয় আবেদনে অতিসক্রিয়তা: গত ৩ জুন যখন বিক্ষুব্ধ বিধায়কদের তরফে সন্দীপন সাহার নেতৃত্বে দ্বিতীয় আবেদন জমা পড়ল, তখন স্পিকার কোনও রকম সময় না নিয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সেটি গ্রহণ করলেন কেন?
  • বহিষ্কৃত সদস্যকে স্বীকৃতি: স্পিকার যদি ১ জুন সংশ্লিষ্ট বিধায়কের দল থেকে বহিষ্কারের চিঠি পেয়ে থাকেন, তবে একজন বহিষ্কৃত ব্যক্তিকেই কীভাবে ৩ জুন বিরোধী দলনেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হলো?
  • যাচাই না করে সিদ্ধান্ত: প্রথমে ৭৮ জন বিধায়কের সমর্থনের দাবি করা হয়েছিল। সেই দাবির সত্যতা যাচাই না করেই এবং অন্য পক্ষের বক্তব্য না শুনে কীভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়?

স্পিকারের পক্ষে আইনজীবীর আত্মপক্ষ সমর্থন

স্পিকারের পক্ষে আদালতে সওয়াল করেন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য। তিনি দাবি করেন, তৃণমূলের পাঠানো প্রথম চিঠিতে বিধায়ক দলের কোনও আনুষ্ঠানিক বৈঠকের উল্লেখ বা কার্যবিবরণী (Minutes) ছিল না। তাই স্পিকারের তরফে তা চেয়ে পাঠানো হয়েছিল।

স্পিকারের প্রধান যুক্তিগুলি হলো:

  • স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ: পরবর্তীতে কয়েকজন তৃণমূল বিধায়ক স্পিকারকে লিখিতভাবে জানান যে দলনেতা নির্বাচনের ওই কপিতে তাঁদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। এই গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে স্পিকারকে তদন্তের নির্দেশ দিতে হয়।
  • সশরীরে উপস্থিতি: অন্যদিকে, ৫৮ জন বিধায়ক সশরীরে স্পিকারের সামনে উপস্থিত হয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার পক্ষে প্রস্তাব জমা দেন। যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক সশরীরে উপস্থিত ছিলেন, তাই স্পিকার সেই দাবিকে মান্যতা দেন এবং আলাদা করে তা যাচাইয়ের প্রয়োজন বোধ করেননি।

প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণের নির্দেশ

আদালতে জালিয়াতির অভিযোগ এবং পাল্টা দাবির এই জটিল টানাপোড়েন প্রসঙ্গে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করেন বিচারপতি কৃষ্ণা রাও। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে আইনি প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়ো না করে সমস্ত পক্ষের কথা শোনা উচিত ছিল।

বিচারপতি তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন:

“স্বাক্ষর জাল কি না, আদালত এখনই সেই বিতর্কের গভীরে যাচ্ছে না। কিন্তু যিনি বা যে দল প্রথম আবেদনটি করেছিলেন, তাঁদের শুনানির কোনও ন্যূনতম সুযোগ না দিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আইনি প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের (Natural Justice) নীতি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। মনে রাখতে হবে, কারও বিরুদ্ধে শুধু একটি এফআইআর (FIR) হয়েছে বলেই তাকে সরাসরি জালিয়াত বলে দেওয়া যায় না।”

তৃণমূলের অন্দরের এই নজিরবিহীন বিদ্রোহ ও স্পিকারের সিদ্ধান্তের ওপর এখন কলকাতা হাইকোর্টের রায়ের ওপরই নির্ভর করছে রাজ্যের বিরোধী দলনেতার ভাগ্য। আপাতত এই মামলার রায়দান স্থগিত রেখেছে আদালত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *