ড্রাগনের দেশে বাঙালির জয়ধ্বনি, রোবটের অভ্যর্থনা ছাপিয়ে চিনের পাহাড়ি গ্রাম মাতাল ভারতের লোকসংস্কৃতি!

ড্রাগনের দেশে বাঙালির জয়ধ্বনি, রোবটের অভ্যর্থনা ছাপিয়ে চিনের পাহাড়ি গ্রাম মাতাল ভারতের লোকসংস্কৃতি!

চিনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং এবং দালি শহরে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো সপ্তম চায়না সাউথ এশিয়া কোঅপারেশন ফোরাম। আর এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে চিনের বাসিন্দাদের মন জয় করে নিলেন কলকাতা তথা পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের একদল প্রতিভাবান শিল্পী। কুনমিংয়ের হাইকেং কনফারেন্স হলে আয়োজিত এই ফোরামে ভারত ছাড়াও আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছিলেন।

প্রযুক্তির চমক ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন

কনফারেন্স হলে প্রবেশের মুখেই অতিথিদের জন্য অপেক্ষা করছিল আধুনিক প্রযুক্তির এক অনন্য চমক। সেখানে আগত প্রতিনিধিদের অভ্যর্থনা জানায় চিনা রোবট এবং রোবট সারমেয়। ‘নি শি’ বললেই হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে রোবট, আবার মাথায় হাত বোলালেই আহ্লাদ প্রকাশ করছে যান্ত্রিক সারমেয়। তবে এই চরম প্রযুক্তির আবহকে ছাপিয়ে মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে ভারত ও চিনের সাংস্কৃতিক ভাব আদানপ্রদান। কলকাতার ‘কনসাল জেনারেল অফ পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না’-র উদ্যোগে আয়োজিত এই সফরে সঙ্গীতশিল্পী অর্ক মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ১০ জনের একটি প্রতিনিধি দল চিনে পৌঁছায়। চিনা শিল্পীদের সঙ্গে সুর, তাল ও তুলির টানে একাত্ম হয়ে ওঠেন বাঙালি তথা ভারতীয় শিল্পীরা।

পাহাড়ি গ্রামে বাংলার খমক আর ওড়িশি নৃত্য

কুনমিংয়ের ইউনান আর্টস ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু করে দালির প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রাম ‘আনি মো’—সবত্রই ছড়িয়ে পড়ে ভারতীয় লোকসংস্কৃতির ধারা। কবি ও গায়িকা ফুল্লরা মুখোপাধ্যায় এবং অর্ক মুখোপাধ্যায়ের বাংলা ও প্রাদেশিক গানের সঙ্গে নিলয় সেনগুপ্ত, অনুস্মিতা ভট্টাচার্য ও সাগরিকা মোহান্তির ওড়িশি ও লোকনৃত্য দর্শকদের মুগ্ধ করে। সেই সঙ্গে প্রদর্শিত হয় চিত্রশিল্পী যুগল সরকারের আঁকা ছবি এবং মণিপুরের গায়ক থাংজামাং কিপগেনের গান। ইউনানের আদিবাসী গ্রামে ২৫টি সম্প্রদায়ের মানুষের বাস, সেখানেও স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী বাঁশি ও ড্রামের তালে পা মেলান ভারতীয় শিল্পীরা। বিশেষ করে ‘আনি মো’ নামক সঙ্গীত গ্রামে অর্ক মুখোপাধ্যায়ের খমকের আওয়াজ এবং অর্কময়ের লোকগীতি এক জাদুকরী পরিবেশ তৈরি করে।

সাংস্কৃতিক কূটনীতি ও তার প্রভাব

এই ধরণের উৎসব ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মূল কারণ হলো দুই প্রতিবেশী দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও বোঝাপড়া আরও দৃঢ় করা। রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে শিল্প যে অত্যন্ত সহজে দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে কাছাকাছি আনতে পারে, এই সফর তারই প্রমাণ। চিনের প্রত্যন্ত গ্রামের লোকশিল্পীদের সঙ্গে ভারতীয় শিল্পীদের এই মেলবন্ধন আগামী দিনে এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং পর্যটন ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভাঙা আসবাবে গাছ পুঁতে নতুন করে সেজে ওঠা চিনের প্রত্যন্ত গ্রামগুলি যেভাবে বিশ্বকে পুনর্জীবনের বার্তা দিচ্ছে, ঠিক একইভাবে এই আয়োজন ভারত ও চিনের সাংস্কৃতিক কূটনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *