স্নাতকে ভর্তিতে চরম অনীহা ও কলকাতার নামী কলেজে হাজার হাজার আসন ফাঁকা!

স্নাতকে ভর্তিতে চরম অনীহা ও কলকাতার নামী কলেজে হাজার হাজার আসন ফাঁকা!

কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ও নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে স্নাতক স্তরে ভর্তির ক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন অনীহা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টাল চালুর পর উচ্চশিক্ষা দপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে প্রকাশ পেয়েছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। তথ্য অনুযায়ী, কলকাতার কলেজগুলির জন্য মোট অনুমোদিত আসনের সংখ্যা ৯৩ হাজার হলেও, বর্তমান সময় পর্যন্ত মাত্র ৩৩ হাজার পড়ুয়া ভর্তি হয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ৬০ হাজার আসনই এখনো ফাঁকা পড়ে রয়েছে, যা মহানগরের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে এক বড় বিপর্যয় সংকেত। এমনকি ভর্তির নিরিখে রাজ্যের প্রথম ১৫টি সফল কলেজের তালিকার মধ্যেও কলকাতার একটি কলেজও নিজের জায়গা করে নিতে পারেনি।

মফস্বলের তুলনায় পিছিয়ে কলকাতা, শীর্ষে জেলাগুলির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

চলতি বছরের ১৯ মে থেকে রাজ্যের ৪০০-র বেশি কলেজে স্নাতক স্তরে ভর্তির জন্য কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টাল চালু হয়, যেখানে প্রায় ৩ লক্ষের বেশি ছাত্রছাত্রী আবেদন করেছিলেন। তবে মফস্বল ও জেলাগুলির তুলনায় কলকাতার কলেজগুলি ভর্তির দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। ‘আপগ্রেড রাউন্ড’ শুরুর আগে ভর্তির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শীর্ষে রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙা হিন্দু কলেজ, যেখানে ইতিমধ্যে ২,৮০০ ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর কলেজ (২,৭০০ পড়ুয়া) এবং তৃতীয় স্থানে হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়া কলেজ (২,৫০০ পড়ুয়া)। কলকাতার নামী কলেজগুলি যেখানে শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে, সেখানে জেলাগুলির এই সাফল্য উচ্চশিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণের এক নতুন রূপরেখা নির্দেশ করছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দাপট ও ভৌগোলিক প্রভাব, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

কলকাতার কলেজগুলিতে এই তীব্র আসন সংকটের পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন শিক্ষাবিদেরা। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন ‘ওয়েবকুটা’-র দাবি, কলকাতায় সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক পরিকাঠামো ও প্লেসমেন্টের আকর্ষণে অনেক সামর্থ্যবান পড়ুয়াই সরকারি বা সরকারপোষিত সাধারণ ডিগ্রি কলেজের তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন। অন্যদিকে, জেলাগুলির ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থান একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। মফস্বলে এক একটি কলেজের মধ্যবর্তী দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায়, গ্রামীণ ও শহরতলির ছাত্রছাত্রীরা যাতায়াতের সুবিধা ও খরচের কথা মাথায় রেখে ঘরের কাছের স্থানীয় কলেজগুলিতেই ভর্তি হওয়াকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

আসন ফাঁকা থাকার এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা ভবিষ্যতে সরকারি কলেজগুলির পরিকাঠামোগত অস্তিত্ব এবং শিক্ষক পদের স্থায়িত্বের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শুধু কলকাতাই নয়, দক্ষিণ ২৪ পরগনার কলেজগুলিতেও ৭২ হাজার আসনের মধ্যে মাত্র ২৬ হাজার পূরণ হয়েছে, যা সামগ্রিক সংকটকে আরও স্পষ্ট করে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি জানান, বর্তমান ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পর শিক্ষা দপ্তর এই বিষয়ে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করবে। গত ১০ বছরের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির সামগ্রিক চিত্র পর্যালোচনা করে আগামী বছর ভর্তির আগেই বড় ধরনের নীতিগত ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *