মিম-রিলের আড়ালে ঘাম আর চোখের জলের জয়! নিঃশব্দ জেদ ও আত্মত্যাগে কীভাবে নতিস্বীকার করাল কেন্দ্রকে?

মিম-রিলের আড়ালে ঘাম আর চোখের জলের জয়! নিঃশব্দ জেদ ও আত্মত্যাগে কীভাবে নতিস্বীকার করাল কেন্দ্রকে?

সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই ভেসে উঠছিল রকমারি উপহাসে ভরা পোস্টার, ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান কিংবা তরুণদের নাচ-গানের টুকরো কোলাজ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল, নয়া দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা নিট (NEET-UG 2026) আন্দোলন বুঝি কেবল ‘জেন জি’ (Gen Z)-র ডিজিটাল রসিকতার বিনোদন কেন্দ্র।

কিন্তু এর আড়ালেই লুকিয়ে ছিল অন্য এক যন্তর মন্তর— যেখানে মিশে ছিল ফুটপাথের কঠিন কংক্রিটে ঘুমের যন্ত্রণা, দুর্গন্ধযুক্ত সুলভ শৌচালয়, স্যাঁতসেঁতে বিছানা আর সংক্রামক ব্যাধির আশঙ্কাকে তুচ্ছ করে স্রেফ বেঁচে থাকার এক অদম্য প্রতিবাদ।

যে আন্দোলনের জেরে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান, তার জ্বালানি কেবল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের লাইক বা শেয়ার থেকে আসেনি। এসেছে হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থীর অদম্য সহনশীলতা ও নিঃশব্দ আত্মত্যাগ থেকে।

জুলাইয়ের ভ্যাপসা গরম ও বর্ষার ছপছজলর মধ্যেই টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দিল্লির রাজপথকে অস্থায়ী আস্তানায় পরিণত করেছিলেন আন্দোলনকারীরা। সেখানে দিনের আলোয় চলত স্লোগান ও ভাষণ, আর রাত বাড়লেই শুরু হতো পিচঢালা রাস্তায় একটুখানি জায়গা করে নিয়ে গা এলিয়ে দেওয়া। সামান্য পাতলা চাদর কিংবা পিচবোর্ডের টুকরো পেতে রাজপথেই বিছানা পাততেন তাঁরা। দামি জিনিসপত্র বাঁচাতে মাথার নীচেই গোঁজা থাকত পিঠের ব্যাগ। মূল মঞ্চের কাছে কয়েকটি ফ্যান ছাড়া পুরো এলাকাতেই হাওয়া বাতাসের বালাই ছিল না।

আন্দোলনের সবচেয়ে কঠিন বিষয়টাই ছিল নোংরা সুলভ শৌচালয়। ঠায় লাইনে দাঁড়িয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শৌচকর্ম সারতে গিয়ে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের (UTI) মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়। বহু ছাত্রী বাধ্য হয়ে দীর্ঘ সময় প্রস্রাব চেপে রাখতেন, যার ফল হতো মারাত্মক। তবুও পরের দিন সকালে সেই যন্ত্রণা চেপে আবার একসঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতেন তাঁরা।

মিম ও ভাইরাল ভিডিও আন্দোলনকে দেশের দূরদূরান্তে পৌঁছে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আন্দোলনের গতি ধরে রেখেছিল অলক্ষ্যে থাকা কিছু মুখ। উত্তরপ্রদেশের ২১ বছর বয়সি হাসান আলির মতো স্বেচ্ছাসেবকরা ভিনরাজ্য থেকে আসা শিক্ষার্থীদের রাতে থাকার জায়গা করে দেওয়া, বয়স্কদের চেয়ার এগিয়ে দেওয়া কিংবা পানীয় জলের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে আন্দোলনকে সচল রেখেছিলেন।

আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সোনম ওয়াংচুক অনশন করলেও, আলো-ঝলমলে প্রধান মঞ্চ থেকে কিছুটা দূরে ছোট একটি তাঁবুতে একই সঙ্গে অনশনে বসেছিলেন আলিগড়ের বাহাদুর সিং ও লখনউয়ের দীপক যাদব। কয়েক সপ্তাহ আগেও যাঁরা একে অপরকে চিনতেন না, তাঁরা পেটে খিল, শারীরিক যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তা ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে এক আত্মিক পরিবার হয়ে উঠেছিলেন। একে অপরের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা বা ওষুধ জোগাড় করার এই নিবিড় বন্ধন ক্যামেরার আড়ালেই থেকে গেছে।

২১ বছরের পিএসসি (PCS) পরীক্ষার্থী অশ্বিনী বর্মার মতো হাজার হাজার তরুণ আন্দোলনের রিল দেখে আসেননি। গত ২০ জুলাই ‘চলো সংসদ’ অভিযানের সময় পুলিশ ও র‍্যাফ (RAF)-এর লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস এবং ছররা বন্দুকের ব্যবহারের পরই ভিড় নিয়ন্ত্রণ হারায়। তবে এই পুলিশি দমনপীড়নই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পুলিশের এই বলপ্রয়োগই অশ্বিনীর মতো ঘরকুনো ছাত্রদের রাজপথে নামতে বাধ্য করে। নিজের পরিচয় গোপন রাখতে মুখে মাস্ক পরেই আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন তাঁরা।

ইতিহাস যখন এই ছাত্র আন্দোলনের মূল্যায়ন করবে, তখন হয়তো ভাইরাল মিমগুলোর কথাই বেশি আলোচনা করবে। কিন্তু ইতিহাস এ-ও জানে, সেই লড়াইয়ের আসল চালিকাশক্তি ছিল নাম না-জানা শত শত তরুণের ঘাম, ক্লান্তি এবং চুপচাপ সয়ে যাওয়া আত্মত্যাগের দীর্ঘ লড়াই। যাঁদের দীর্ঘ সংগ্রামের মুখেই শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে কেন্দ্র সরকার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *