একটি এফআইআর-ই কি শেষ করে দেবে কেরিয়ার? আন্দোলন করার আগে জানুন কঠোর আইনি নিয়ম!

“আমার পুলিশ কেসের কোনও ভয় নেই। আমরা কী ভুল করেছি? আমরা সরকারকে নিজেদের দাবির কথা জানিয়েছি… আমাদের একটা ভাল শিক্ষাব্যবস্থা চাই।” দিল্লির যন্তর মন্তরে আয়োজিত ছাত্র বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বুক ফুলিয়ে এই কথা বলেছিলেন ২২ বছরের তরুণ রবি। কিন্তু রবির মতো অনেকে এভাবে প্রতিবাদের ঝুঁকি নিলেও, তাঁদের আশপাশের বহু ছাত্রছাত্রীই নিজেদের মুখ ঢেকেছিলেন মাস্ক ও চশমায়।
গত ২০ জুলাই ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র ডাকে নিটের প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে আয়োজিত ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে দিল্লি। আর সেই বিক্ষোভের পরেই সামনে এসেছে এক অন্য চিত্র—ছাত্রদের আইনি সুরক্ষা, পুলিশের নজরদারি ক্যামেরা থেকে বাঁচার উপায় এবং ভবিষ্যতে কেরিয়ারের উপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র চর্চা।
কেন মুখ ঢেকেছিলেন ছাত্রছাত্রীরা?
ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটাল-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বিক্ষোভস্থলে মোতায়েন ছিল দিল্লি পুলিশের ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম (FRS) এবং মোবাইল নজরদারি ভ্যান। পুলিশ দাবি করেছে, অপরাধীদের শনাক্ত করতে এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের সুরক্ষা দিতেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, এই নজরদারি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ।
- অশ্বিনী বর্মার অভিজ্ঞতা: উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ের ২৮ বছরের অশ্বিনী বর্মা পিসিএস (PCS) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর স্পষ্ট কথা, বিচারব্যবস্থার ওপর তাঁর আস্থা রয়েছে, কিন্তু তবুও তিনি মাস্ক পরে এসেছেন যাতে ভবিষ্যতের ভেরিফিকেশনে তাঁকে ভুলভাবে চিহ্নিত বা ফাঁসানো না হয়।
- পরিচয় গোপনের চেষ্টা: পুলিশের এআই ক্যামেরার হাত থেকে নিজেদের পরিচয় বাঁচাতে এবং ক্রাইম রেকর্ড থেকে দূরে থাকতেই মূলত শিক্ষার্থীরা মুখ ঢেকে প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন।
এফআইআর (FIR) হলে কি সত্যিই ছাত্রজীবনের কেরিয়ার শেষ?
এই বিক্ষোভের জেরে ইতিমধ্যেই ১৫টি এফআইআর দায়ের হয়েছে। যদিও সিজেপি ছাত্রদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআর প্রত্যাহারের দাবি তোলায় কেন্দ্র তা মেনে নেয়, তবুও আইনি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে এফআইআর-এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব থাকতে পারে:
১. পাসপোর্ট ও বিদেশ যাত্রা: পাসপোর্ট আইন, ১৯৬৭-এর ৬(২)(এফ) ধারা অনুযায়ী, ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন থাকলে পাসপোর্ট আটকে যেতে পারে। যদিও বিভিন্ন হাইকোর্ট জানিয়েছে যে শুধু এফআইআর মানেই পাসপোর্ট বাতিল নয়, কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় এনওসি (NOC)-র গেরোয় তা পেতে দেরি হতে পারে। এছাড়া আমেরিকা, কানাডা, ইউকে বা ইউরোপের ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও অপরাধমূলক মামলার ইতিহাস বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
২. চাকরি ও ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন: সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবীর মতে, এফআইআর একটি সরকারি রেকর্ড হয়ে যায়। ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি, পিএসইউ বা কনসালটেন্সির ক্ষেত্রে ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশনে এই তথ্য সামনে আসতে পারে, যা পরবর্তীতে নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে।
৩. বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি: অনেক বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বিচারাধীন ফৌজদারি মামলা থাকা শিক্ষার্থীদের সহজে ভর্তি নিতে চায় না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: প্রথমবার বিক্ষোভে গেলে কী কী মাথায় রাখা দরকার?
বম্বে হাইকোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী বিনোদ শেট্টি এবং অন্যান্য আইনি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, যেকোনো আন্দোলনে নামার আগে শিক্ষার্থীদের কিছু মৌলিক বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত—
- পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া।
- কর্মসূচি বা আন্দোলনের সরকারি অনুমতি রয়েছে কি না, তা আগে থেকে যাচাই করা।
- নিজের মৌলিক আইনি অধিকার ও গ্রেফতারি সংক্রান্ত নিয়ম সম্পর্কে সচেতন থাকা।
সবমিলিয়ে, রবি বা অশ্বিনীদের মতো তরুণদের জেদ ও প্রতিবাদের স্পৃহা যতটাই জোরালো হোক না কেন, আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তির যুগে একটিমাত্র এফআইআর কীভাবে একজন তরুণের ভবিষ্যৎ কেরিয়ারের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে, তা নিয়ে এখন চিন্তার ভাঁজ আইনমহলেও।