টিফিন নিয়েও বুলিং, সন্তানের মনের খিদে মেটাতে গিয়ে শেইমিং হচ্ছেন মায়েরাও, সমাধান কী?

টিফিন নিয়েও বুলিং, সন্তানের মনের খিদে মেটাতে গিয়ে শেইমিং হচ্ছেন মায়েরাও, সমাধান কী?

আজকের দিনে অনেক শিশুই এখন বাড়ি ফিরে বাবা-মাকে প্রশ্ন করছে, ‘আমার টিফিনটা বন্ধুদের মতো সুন্দর হয় না কেন?’ এই সাধারণ প্রশ্নটির পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর সামাজিক সংকট, যা ধীরে ধীরে আধুনিক অভিভাবক, বিশেষ করে মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

পল্লবীর বয়স ৩৮, পেশা—সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বছর ১২ আগে বিয়ে হয়েছিল রক্তিমের সঙ্গে। তাঁদের ৯ বছরের একটি ছেলে রয়েছে। রক্তিমের সঙ্গে বর্তমানে ডিভোর্স কেস চললেও ছেলে পল্লবীর কাছেই থাকে। সিঙ্গল মাদার হিসেবে অফিসের চাপ, ছেলের ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের পড়াশোনার খরচ এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধের খরচ সামলানোর পাশাপাশি তাঁর জীবনে জুটেছে এক নতুন মানসিক যন্ত্রণা—ছেলের টিফিন নিয়ে রোজকার অশান্তি।

স্কুলের কড়া গাইডলাইন অনুযায়ী টিফিনে প্রোটিন, ক্যালোরি এবং কার্বোহাইড্রেটের ব্যালান্স ঠিক রাখা তো বটেই, তার ওপর রয়েছে ছেলের বায়না। সহপাঠীদের টিফিনবক্স ভর্তি থাকে সুশি, কিনোয়া রোল, বার্গার বা পাস্তার মতো আকর্ষণীয় ও বিদেশি পদে। সেখানে পল্লবীর ছেলের টিফিন অত্যন্ত সাধারণ ও ঘরোয়া, যা তাঁর বন্ধুদের কথায় ‘নন-ইনস্টাগ্রামেবল’। এর জেরে ক্লাসে হাসির খোরাক হতে হচ্ছে সন্তানকে।

‘লাঞ্চবক্স শেইমিং’-এর নেপথ্যে কোন কারণ?

আগে যেখানে ধোকলা, থেপলা, পরোটা-তরকারি বা স্যান্ডউইচ স্কুল টিফিনের পরিচিত খাবার ছিল, এখন তার জায়গা নিচ্ছে বেন্টো স্টাইলে সাজানো নানা বিদেশি পদ। পুষ্টিবিদদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ‘প্যাক লাঞ্চ উইথ মি’ জাতীয় ভিডিও এবং ইনস্টাগ্রাম ও পিন্টারেস্টে ছড়িয়ে পড়া আকর্ষণীয় টিফিনের ছবি এই প্রবণতাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

মনোবিদ ডাঃ সমর্পিতা চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ফ্যান্সি টিফিন বা বিদেশি খাবার খাওয়াটা এখন সোশ্যাল স্ট্যাটাস এবং সোশ্যাল একসেপ্টেন্স-এর একটা অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের মধ্যে, এবং মূলত ১২-১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এর পেছনে কাজ করে ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা ‘ফোমো’ (FOMO)—বাচ্চাদের মনে হয় তারা যেন কোনো কিছু থেকে পিছিয়ে পড়ছে।

সমাজকর্মী শাশ্বতী ঘোষ বলেন, “শুধু তো সময় নয়, আর্থিক দিক থেকেও সব সময় এই ধরনের আবদার মেটানো সম্ভব হয় না। কিন্তু এই সমস্যার দায়টা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসে পড়ে মায়েদের ঘাড়েই। তাঁরা যে কী ভাবে এর সঙ্গে মোকাবিলা করবেন, সত্যিই জানা নেই।”

কেন ফ্যান্সি টিফিন না হলে বিরক্ত হচ্ছে বাচ্চারা?

সাইকোলজিস্ট প্রশান্ত কুমার রায়ের মতে, ছোটবেলা থেকেই আমরা ফাস্ট ফুড বা ফ্যান্সি ফুডকে রিওয়ার্ডিং খাবার বা সেলিবরেশনের অংশ হিসেবে চিনি। অভিভাবকরাই এই ধারণা সন্তানের মনে প্রবেশ করান। একদিন বাচ্চা না খেলেই তাকে খাওয়ানোর জন্য বা কুইক সলিউশন খুঁজতে গিয়ে সেই খাবার বারবার দিলে জন্ম নেয় ‘ফাসি ফুড বিহেভিয়ার’ (Fussy Food Behaviour)।

সমাজকর্মী পিয়া চক্রবর্তী জানাচ্ছেন, পাশের বন্ধুর ফ্যান্সি টিফিন দেখে অ্যাসপিরেশন তৈরি হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার সাজানো-গোছানো কনটেন্টের প্রভাব সেই চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। টিফিনবক্স আজ একপ্রকার স্টেটাস সিম্বলে পরিণত হয়েছে—যেখানে জাজল বেন্টো-স্টাইল বক্স, সিলিকন টিফিন এবং পার্সোনালাইজড কৌটোর দাম চারশো থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর সঙ্গে স্পেশালিটি চিজ, ইমপোর্টেড ফল এবং প্যাকেটজাত স্ন্যাকস মিলিয়ে মাসে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। পাশাপাশি, প্রতিদিন কেবল ‘প্রেজেন্টেবল টিফিন’ বানাতে মায়েদের বাড়তি সময় ও মানসিক শ্রম ব্যয় করতে হচ্ছে।

বুলিং এবং বাবা-মায়ের মানসিক চাপ

এই পরিস্থিতির পেছনে প্রধানত দুটি বিষয় কাজ করে। প্রথমত, সন্তান পিছিয়ে পড়বে বা অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে পড়বে—এই ভয়। দ্বিতীয়ত, অনেক সময় এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সহপাঠীদের বুলিং বা উপহাসের শিকার হতে হয় বাচ্চাদের। মনোবিদরা মনে করেন, সমাজ অনেক সময় দুটো উপায়ে বড় হতে শেখায়—এক, নিজের যোগ্যতায় পরিশ্রম করে; দুই, অন্যদের ছোট করে নিজেকে বড় দেখিয়ে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় বুলিং।

এই প্রবণতা থেকে মুক্তির উপায় কী?

১. ডিজিটাল সচেতনতা ও বাউন্ডারি তৈরি: সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল ট্রেন্ড সম্পর্কে বাচ্চাকে স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে। তাকে জানাতে হবে যে সোশ্যাল মিডিয়ার জীবন আর বাস্তব জীবন এক নয়; ভিউ বাড়ানোর জন্য কৃত্রিমভাবে অনেক কিছু সাজানো হয়।

২. নিয়ম ও রুটিন মেনে চলা: প্রতিদিন রাতে হুট করে ফ্যান্সি টিফিন বানিয়ে দেওয়ার অভ্যাস বন্ধ করতে হবে। সপ্তাহে বা মাসে একটি নির্দিষ্ট দিন ঠিক করে দেওয়া যেতে পারে, যেদিন বিশেষ টিফিন দেওয়া হবে। এর ফলে সন্তানরা শিখবে যে চাইলেই সবকিছু সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না।

৩. দেশীয় খাবারের গুরুত্ব: বিদেশি খাবারের পাশাপাশি দেশীয় এবং স্থানীয় শাকসব্জি বা বাঙালি খাবার খাওয়ার ওপর জোর দিতে হবে। বাবা-মায়েদের নিজেদেরই এই ব্যাপারে দৃঢ় এবং সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *