লাঠির জবাবে জাতীয় সঙ্গীত আর রেন ডান্স, চিরাচরিত রাজনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সফল জেন জ়ি আন্দোলন!

লাঠির জবাবে জাতীয় সঙ্গীত আর রেন ডান্স, চিরাচরিত রাজনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সফল জেন জ়ি আন্দোলন!

দিল্লি হোক বা কলকাতা—দেশের নানা প্রান্তে দানা বেঁধে ওঠা জেন জ়ি (Gen Z)-এর আন্দোলন চিরাচরিত রাজনৈতিক আন্দোলনের সংজ্ঞাটাই যেন একেবারে বদলে দিয়েছে। লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে আসা পুলিশের জবাবে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া এবং পুলিশকে পরাস্ত করার মতো অভিনব দৃশ্য অতীতে দেখা যায়নি। বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান চালালেও পিছু না হটে ‘রেন ডান্স’-এর আনন্দ উপভোগ করা, পুলিশের ব্যারিকেডকে গাড়ির মতো ব্যবহার করা কিংবা দড়ি ধরে ‘টাগ অফ ওয়ার’-এ মেতে ওঠার মতো ঘটনাগুলো ছিল সম্পূর্ণ ছক ভাঙা। শাসক ও বিরোধী—উভয় শিবিরেরই সিলেবাসের সম্পূর্ণ বাইরে ছিল এই আন্দোলন। একদিকে যেমন আন্দোলন দমানোর কোনো উপায় খুঁজে পায়নি শাসকপক্ষ, তেমনই অন্যদিকে আন্দোলনকে হাইজ্যাক করতে পারেনি বিরোধীরাও।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আটকে থাকা বিপ্লব একসময় আছড়ে পড়ে রাজধানীর যন্তর মন্তরে। আর তার ফেইলেই শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হন ধর্মেন্দ্র প্রধান। তবে এখানেই শেষ নয়, নতুন স্ফুলিঙ্গ এবার তৈরি হয়েছে ‘ই–২০ জনতা পার্টি’-র মাধ্যমে। ইনস্টাগ্রামে এই প্রোফাইল তৈরি হতেই মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। পেট্রলের সঙ্গে ইথানল মেশানোর ফলে গাড়ি ও মোটরবাইকের ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এই অভিযোগকে সামনে রেখে এবার জেন জ়ি-র মূল টার্গেট কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও হাইওয়ে মন্ত্রী নীতিন গড়কড়ি।

অতীতে কেন্দ্র বা বিভিন্ন রাজ্যের সরকারের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন বা ২০১৯ সালের ‘নো এনআরসি’ আন্দোলন কিংবা এই রাজ্যের ‘অভয়া আন্দোলন–রাত দখল’-এর মতো প্রতিবাদ দেখা গেছে। কিন্তু কোনো আন্দোলনের পরিণতিই এমন তাৎক্ষণিক সাফল্য এনে দেয়নি, যা এনে দিয়েছে দিল্লির জেন জ়ি আন্দোলন। জেন জ়ি প্রজন্ম আন্দোলন করেছে নিজেদের ভাষায়, নিজেদের মতো করে। মূলস্রোতের কোনো রাজনৈতিক দল সেখানে পাত্তাই পায়নি। আন্দোলনকে ভেতর থেকে ভাঙার সরকারি কৌশল কিংবা হাইজ্যাক করার বিরোধী কৌশল—কোনোটিই কাজ করেনি। গোড়ার দিকে ‘অ্যান্টি ন্যাশনাল’, ‘বিদেশি ফান্ডিং’ বা ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’-এর তত্ত্ব ছড়ানোর চেষ্টা হলেও শেষ পর্যন্ত সেই চেনা অস্ত্রে আন্দোলন দমন করা যায়নি।

দিল্লির আন্দোলনের সমর্থনে কলকাতার মিছিলে অংশ নেওয়া আশুতোষ কলেজের ছাত্র সৌভিক দাস জানান, প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠনগুলির চেয়ে সাধারণ পড়ুয়া এবং বেকার যুবকদের উপস্থিতিই ছিল সবচেয়ে বেশি। কেউ প্রথাগত পোস্টার আঁকতে না পারলেও খাতার মলাট, ডায়েরির পাতা বা আর্ট পেপারে যে যেভাবে পেরেছেন ছবি এঁকেছেন এবং গান গেয়েছেন। এই স্বতঃস্ফূর্ততাই আন্দোলনকে সাফল্যের মুখ দেখিয়েছে।

ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক তথা রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুস্নাত দাসের মতে, বারবার স্বপ্নভঙ্গ হতে হতে যুবসমাজ বুঝে গেছে যে শাসক দল তাদের জন্য কিছু করবে না এবং বিরোধী দলগুলোর ওপরও তাদের কোনো ভরসা নেই। তাই তারা নিজেরাই দলমত নির্বিশেষে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদে নেমেছে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক দল নয়—সাধারণ মানুষের পরিচয়টাই বড় হয়ে উঠেছে। প্রতিবাদের ধরনও ছিল ভীষণ সৃষ্টিশীল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়ে লেখা স্লোগান, আইপ্যাডের ব্যবহার, গিটার-ইউকুলেলের সুর এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন লাগানো পোস্টারের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও দুর্নীতিকে তীব্র কটাক্ষ করা হয়েছে।

সিপিএম নেতা ময়ূখ বিশ্বাসের মতে, এমন অভূতপূর্ব ও ছক ভাঙা আন্দোলন এর আগে কেউ দেখেনি। অন্যদিকে, তৃণমূল নেতা বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ওদের কোনো ধান্দাবাজি বা ক্ষমতা দখলের লোভ ছিল না বলেই লক্ষ্য স্থির রেখে তারা জয় ছিনিয়ে এনেছে। তবে রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায়ের দাবি, এটি দেশদ্রোহীদের উস্কানিতে বিদেশি ফান্ডে চলা এক নৈরাজ্য ছাড়া আর কিছু নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *